রাজধানীতে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অধিকাংশ সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের স্বল্পচাপ ও সীমিত সরবরাহের কারণে চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে দৈনিক আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি গাড়ির জমা, কিস্তি ও পরিবারের খরচ চালানো নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
রবিবার (২৬ জুলাই) মালিবাগ, বিশ্বরোড, মতিঝিল, মানিকনগর, খিলগাঁও, বনশ্রী, মুগদা, সবুজবাগ, মেরুল বাড্ডাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি স্টেশনেই গ্যাস নেওয়ার জন্য দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা। কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে একটি কমপ্রেসার দিয়ে সীমিত পরিসরে সরবরাহ করা হচ্ছে, আবার কোথাও সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
চালকদের অভিযোগ, গত এক সপ্তাহে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। অনেককে চার থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এত সময় গ্যাস সংগ্রহে ব্যয় হওয়ায় দিনের বড় অংশই কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এলেও প্রতিদিনের জমা ও কিস্তি আগের মতোই পরিশোধ করতে হচ্ছে।
মালিবাগের এক চালক জানান, ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও দুপুর পর্যন্ত গ্যাস পাননি। আরেক চালক বলেন, গ্যাস ভরে মাত্র দুটি ট্রিপ দেওয়ার পরই আবার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।
গাবতলী এলাকার রাইড শেয়ারিং চালক আশরাফ আলী বলেন, তিন দিন ধরে গ্যাস সংকটে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। অনেক ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকায় দূরের স্টেশনে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। তার ভাষায়, আগে যেখানে একটি সিলিন্ডারে প্রায় ১ হাজার ১০০ টাকার গ্যাস ভরানো যেত, এখন কম চাপের কারণে ৫০০ টাকার গ্যাসও ঢুকছে না।
কল্যাণপুরের একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের কর্মী ফিরোজ জানান, সারাদিন কমপ্রেসার চালিয়েও প্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করা যাচ্ছে না। ফলে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না।
এই দিকে, ঢাকা-চটগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী থেকে সাইনবোর্ড- ইউনাইটেড সিএনজি স্টেশন, স্পিডবার্ড সিএনজি স্টেশন, টোটাল সিএনজি লিমিটেড, ডব্লিউ জেড সিএনজি অ্যান্ড সার্ভিসিং, আসমা আলী সিএনজি ফুয়েলিং অ্যান্ড ওয়ার্কশপে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস এবং অটোরিকশার দীর্ঘ লাইন।
প্রত্যেকটি পাম্পে দেড়শ থেকে দুই শতাধিক গাড়ি গ্যাসের জন্য দুই থেকে তিন ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাইভেটকার চালক আল-আমিন জানান, আমি উত্তরায় গ্যাস না পেয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের রায়েরবাগ ইউনাইটেড সিএনজি স্টেশনে এসেছি। এখানেও দীর্ঘ লাইন, এক ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি।
মাইক্রোবাস চালক জাকির হোসেন জানান, আমি উবারে গাড়ি চালাই। ঢাকা সিটির কোথাও গ্যাস নেই। সেই কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মাতুয়াইল স্পিডবার্ড সিএনজি স্টেশনে এসেছি। এখানে দুই ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষার পর মাত্র আড়াইশ টাকার গ্যাস পেয়েছি; যেখানে আগে সাত থেকে আটশ টাকার গ্যাস পেতাম।
অটোরিকশা চালক শুক্কুর আলী জানান, আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর ১২০ টাকার গ্যাস পেয়েছি। আগে আড়াইশ থেকে তিনশ টাকার গ্যাস পেতাম।
সিএনজি স্টেশনের নজেলম্যান ফজলে রাব্বি বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় গত চার দিন ধরে এ সমস্যা দেখা দিয়েছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাতেও পড়তে শুরু করেছে। সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা কমে যাওয়ায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় ভাড়াও বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কক্সবাজারের মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে।
তিতাস গ্যাসের আওতাধীন এলাকায় দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ মিলছে প্রায় ১৫৫ কোটি ঘনফুট। ফলে প্রয়োজনীয় চাপ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্শন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর বলেন, ফিলিং স্টেশনগুলোতে ১৫ পিএসআই চাপের গ্যাস পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৩ থেকে ৫ পিএসআই চাপ পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় কমপ্রেসার পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না, ফলে গাড়িতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস সরবরাহও সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, মহেশখালীর কারিগরি সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই সংকটও দ্রুত কাটবে না।
এদিকে বিভিন্ন দাবিতে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতি আগামী ৩০ জুলাই ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে। তবে ফারহান নূর বলেন, বর্তমান সংকট ধর্মঘটের কারণে নয়; বরং গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণেই এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। সরকার দাবি পূরণে উদ্যোগ নিলে এবং গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হয়ে আসবে।