এক সময় বড় ধরনের সমন্বিত হামলা, সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক এবং প্রশিক্ষিত সদস্যদের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিত উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো।
কিন্তু গত এক দশকের ধারাবাহিক অভিযানে তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার পর নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নজরে এসেছে নতুন এক প্রবণতা। বড় হামলার পরিবর্তে এখন ছোট পরিসরে, সীমিত উপকরণ ব্যবহার করে জনমনে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করার কৌশল গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজধানীর মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে আইইডিসদৃশ বস্তু উদ্ধারের সাম্প্রতিক ঘটনা সেই পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি কেবল একটি বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া যাচাই, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। যদিও তদন্ত এখনো চলমান এবং কে বা কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি, তবু ঘটনাটি নিরাপত্তা পরিকল্পনার নতুন চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট করেছে।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে আইইডিসদৃশ বস্তু শনাক্ত করা হয়। দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের সন্দেহের ভিত্তিতে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল। পরে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে সেটি নিষ্ক্রিয় করা হয়।
এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হলেও ঘটনাটি রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, আলামত বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টদের শনাক্তে তদন্ত চলছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়; তবে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা জরুরি।
এর আগে গত ৫ জুলাই ভোর সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মিনি কক্সবাজার এলাকা থেকে উগ্রবাদে জড়িত থাকার অভিযোগে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ।
গ্রেপ্তাররা হলেন-শাহ আমানত সাবির, হোসাইন তানিম, জুনায়েদ, আতাউল্লাহ শাহ, আবিদুর রহমান ও বায়োজিত। পরে যাত্রাবাড়ী থানার পরিদর্শক এ বি সিদ্দিক আসামিদের আদালতে হাজির করে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।
পুলিশ বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা ওই স্থানে কী কারণে জড়ো হয়েছিল তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। তবে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, তারা উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।
বদলে গেছে হুমকির ধরন : নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বর্তমান সময়ে চরমপন্থী নেটওয়ার্কগুলো আগের মতো বড় দল নিয়ে হামলার পরিবর্তে ছোট সেল বা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিকে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে যাকে প্রায়ই ‘লোন উলফ’ হামলা বলা হয়, সেখানে ব্যক্তি নিজেই উগ্র মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে সহিংস কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে, যদিও সব ঘটনা একই ধরনের নয়।
এ ধরনের কৌশলের উদ্দেশ্য অনেক সময় ব্যাপক প্রাণহানি নয়; বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ভয় সৃষ্টি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত করা।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নতুন বাস্তবতা : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উগ্রবাদ এখন কেবল অস্ত্রের লড়াই নয়; এটি তথ্য, প্রযুক্তি ও প্রচারণারও লড়াই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে উসকানিমূলক বক্তব্য, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং সহিংস মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা বিশ্বজুড়েই নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশেও অনলাইনভিত্তিক চরমপন্থী প্রচারণা, ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং তরুণদের লক্ষ্য করে উগ্র মতাদর্শ প্রচারের ঝুঁকি নিয়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সতর্ক রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অতীতের অভিজ্ঞতা : বাংলাদেশ অতীতে জঙ্গিবাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের বিভিন্ন জেলায় একযোগে বোমা হামলা এবং ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। এরপর ধারাবাহিক অভিযানে বিভিন্ন জঙ্গি নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কোনো সংগঠনের সাংগঠনিক শক্তি কমে গেলেও মতাদর্শ পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায় না। সময় ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেটি নতুন রূপে ফিরে আসার চেষ্টা করতে পারে। তাই শুধু অতীতের সাফল্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা কৌশলও নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঝুঁকিতে? মেট্রোরেল, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সমুদ্রবন্দর, সেতু ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো যেকোনো দেশের জন্য কৌশলগত সম্পদ। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব স্থাপনার আশপাশে সন্দেহজনক বস্তু উদ্ধারও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। কারণ নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলে শুধু জননিরাপত্তাই নয়, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, পরিবহন ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জিরো টলারেন্স নীতিতে সরকার : সরকার উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বারবার তুলে ধরেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বিশেষায়িত অভিযানের মাধ্যমে যেকোনো ধরনের নাশকতা প্রতিরোধে কাজ চলছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশ না করের শর্তে) ভোরের ডাক’কে বলেন, বড় জঙ্গি নেটওয়ার্ক দুর্বল হলেও বিচ্ছিন্ন নাশকতার ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্তে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।
শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ : বিশেষজ্ঞদের মতে, উগ্রবাদ মোকাবিলায় কেবল পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাদের মতে, তরুণদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সহনশীলতা, নাগরিক মূল্যবোধ এবং দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণ গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে ঘৃণামূলক বক্তব্য, সহিংস উসকানি বা সন্দেহজনক অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তার সময় : নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সিসিটিভি বিশ্লেষণ, বিস্ফোরক শনাক্তকারী প্রযুক্তি, ডগ স্কোয়াড, ড্রোন নজরদারি, সাইবার গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাইও জরুরি বলে তারা মনে করেন।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ : নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- পরিবর্তিত হুমকির ধরন দ্রুত শনাক্ত করা এবং সেই অনুযায়ী প্রতিরোধব্যবস্থাকে আধুনিক করা। কারণ বর্তমান সময়ে চরমপন্থা শুধু মাঠে নয়, ডিজিটাল পরিসরেও বিস্তার লাভ করছে।
মতিঝিলে আইইডিসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনা শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর একটি সফল উদাহরণ হলেও এটি একই সঙ্গে সতর্কবার্তাও।
প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি, তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ, জনসচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এ ধরনের পরিবর্তিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং সচেতন নাগরিকদেরও সম্মিলিত দায়িত্ব। কারণ নিরাপত্তার নতুন বাস্তবতায় সামান্য অসতর্কতাও বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।