বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে বসেছিল এক আবেগঘন সংগীতের আসর। নির্ধারিত সময়ের আগেই দর্শকে পরিপূর্ণ হয়ে যায় মিলনায়তন। সবার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে মঞ্চে ওঠেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা। তাকে স্বাগত জানাতে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান দর্শকরা, আর দীর্ঘ করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন।
৬২ বছরের দীর্ঘ সংগীতজীবনে দেশের সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম প্রধান এই প্রতিষ্ঠানে এবারই প্রথম একক কনসার্টে গান পরিবেশন করলেন রুনা লায়লা। একই আয়োজনে বাংলা গানে তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সম্মাননাও দেওয়া হয়।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। এ ছাড়া দেশের সংগীতাঙ্গনের বিশিষ্ট শিল্পী ও গুণীজনরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন) বলেন, রুনা লায়লার কণ্ঠ দেশের মানুষকে আনন্দ ও আবেগে ভরিয়ে দিয়েছে। তার গান কখনো আনন্দের, কখনো বেদনার সঙ্গী হয়েছে। ৬২ বছর পর শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে এই কালজয়ী শিল্পীকে পাওয়া প্রতিষ্ঠানটির জন্য গৌরবের বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বন্যার্তদের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে তিনি বলেন, এই আয়োজন থেকে প্রাপ্ত অর্থ বন্যাদুর্গত মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, রুনা লায়লা সুরকে সাধনা, সাধনাকে জীবন এবং জীবনকে সংগীতের সৌন্দর্যের জন্য উৎসর্গ করেছেন। বাংলাদেশের এই প্রিয় শিল্পীর প্রতি জাতির শ্রদ্ধা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল রুনা লায়লাকে সম্মাননা প্রদান। দীর্ঘ ৬২ বছরের সংগীতসাধনা এবং বাংলা গানের বিকাশে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তার হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন সংস্কৃতিমন্ত্রী। এ সময় উপস্থিত দর্শক-শ্রোতা ও অতিথিরা করতালির মাধ্যমে তাকে অভিনন্দন জানান।
সম্মাননা গ্রহণের পর মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে ‘দেশের জন্য যারা দিয়ে গেছো প্রাণ’ গান দিয়ে পরিবেশনা শুরু করেন রুনা লায়লা। এরপর তিনি পরিবেশন করেন ‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব’, ‘যখন থামবে কোলাহল/ঘুমে নিঝুম চারপাশ’সহ তার জনপ্রিয় বেশ কয়েকটি গান। পরিচিত গানে শিল্পীর সঙ্গে কণ্ঠ মেলান দর্শকরাও।
প্রায় দেড় ঘণ্টার পরিবেশনায় আধুনিক গান, চলচ্চিত্রের গান ও দেশাত্মবোধক সংগীত মিলিয়ে প্রায় ১০টি গান পরিবেশন করেন তিনি। প্রতিটি গানের পরই করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে মিলনায়তন। দর্শকদের সম্মিলিত কণ্ঠ আর আবেগঘন মুহূর্তে তৈরি হয় স্মরণীয় এক সংগীতসন্ধ্যা।
সম্মাননা গ্রহণের অনুভূতি প্রকাশ করে রুনা লায়লা বলেন, সংগীতজীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মানুষের ভালোবাসা, সম্মান ও দোয়া পাওয়া। নতুন প্রজন্মের কাছে গান ও স্মৃতিগুলো পৌঁছে দিতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ৬২ বছরের পেশাদার সংগীতজীবনে শিল্পকলা একাডেমিতে কয়েকবার গান করলেও একক কনসার্ট এবারই প্রথম বলে জানান তিনি।
শুরু থেকেই শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। রুনা লায়লার এই আয়োজন ঘিরে দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে ছিল ব্যাপক আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস। পাশাপাশি অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রির পুরো অর্থ বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিল্পকলা একাডেমি।
এর আগে শিল্পকলা একাডেমি বরেণ্য সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন ও সৈয়দ আব্দুল হাদীর সম্মানে একই ধরনের সম্মাননা ও একক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল।