দীর্ঘ ১১ বছর ধরে নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি। আগামী ১ জুলাই থেকে নবম পে-স্কেল কার্যকরের আশা থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসায় চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ সময়োপযোগী হলেও এটি কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থানই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ। নবম জাতীয় পে-স্কেলের আওতায় তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতার জন্য প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ খাতে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।
নতুন বাজেটে ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় অতিরিক্ত ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ অর্থ সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিতে ব্যয় করা হবে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যয় বাড়লেও সরকারের রাজস্ব আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়তে পারে। এতে একদিকে বৈদেশিক ঋণের চাপ বৃদ্ধি, অন্যদিকে দেশীয় ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া হলে তারল্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
সরকারও স্বীকার করছে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একযোগে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন সহজ হবে না। তাই ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে মূল বেতন (বেসিক) বাড়ানো হতে পারে। পরে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা যুক্ত করা হবে।
এদিকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সম্প্রতি অর্থ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকের পর সংস্থাটি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকারের রাজস্ব আয় এখনো প্রত্যাশার তুলনায় কম এবং বাজেট ঘাটতির চাপও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি করলে সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। পাশাপাশি বাজারে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ হলে মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন জরুরি হলেও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কৌশলই সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে। এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দৃষ্টি সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের দিকে।