টার্গেটে তরুণ প্রজন্ম, নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

একটি স্মার্টফোন, একটি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট, আর কয়েক মিনিট সময়, এতেই শুরু হচ্ছে এমন এক খেলায় প্রবেশ, যেখান

2026-07-25T12:41:28+00:00
2026-07-25T13:52:12+00:00
  সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬,
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
অনলাইন জুয়ার অদৃশ্য সাম্রাজ্য
টার্গেটে তরুণ প্রজন্ম, নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার
শাকিল আহমেদ
শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ১২:৪১ পিএম  আপডেট: ২৫.০৭.২০২৬ ১:৫২ পিএম
সংগৃহীত ছবি
একটি স্মার্টফোন, একটি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট, আর কয়েক মিনিট সময়, এতেই শুরু হচ্ছে এমন এক খেলায় প্রবেশ, যেখান থেকে বের হওয়া অনেকের পক্ষেই আর সম্ভব হচ্ছে না। শুরুতে কয়েকবার জিতিয়ে ব্যবহারকারীর বিশ্বাস অর্জন, এরপর ধীরে ধীরে বড় অঙ্কের বাজিতে প্রলুব্ধ করা, আর শেষ পর্যন্ত সর্বস্ব হারিয়ে ঋণ, পারিবারিক ভাঙন ও মানসিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া, এভাবেই দেশে বিস্তার লাভ করছে অনলাইন জুয়ার অদৃশ্য সাম্রাজ্য।

রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণদেরও এ জুয়ার জালে টেনে নিচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে প্রতিনিয়ত এজেন্ট গ্রেপ্তার, হাজার হাজার এমএফএস অ্যাকাউন্ট জব্দ এবং বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম উদ্ধার হলেও থামছে না এ সিন্ডিকেট বরং পুরোনো ওয়েবসাইট বন্ধ হওয়ার আগেই নতুন ডোমেইন, নতুন অ্যাপ এবং নতুন পেমেন্ট পদ্ধতি নিয়ে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে তারা।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গাজীপুর ও কুমিল্লায় পৃথক অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়ার একটি সক্রিয় চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। অভিযানে উদ্ধার করা হয় প্রায় ৬ হাজার ৬০০টি এমএফএস সিম, ৭০টির বেশি মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস। তদন্তে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য, বাংলাদেশকেন্দ্রিক অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বড় অংশই শেষ পর্যন্ত ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সিন্ডিকেটটি সাধারণ মানুষের নামে এমএফএস এজেন্ট ও মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করে। পরে সেই অ্যাকাউন্টগুলো ব্যবহার করে জুয়ার টাকা জমা নেওয়া হয়। প্রতিদিনের লেনদেন শেষে অর্থ বিভিন্ন ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে ইউএসডিটিসহ বিভিন্ন ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনা হয়। এরপর বিদেশে থাকা নিয়ন্ত্রকদের ডিজিটাল ওয়ালেটে অর্থ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ফলে অর্থ কোথা থেকে এলো এবং কোথায় গেল, তা অনুসরণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

সাইবার অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বড় অস্ত্র প্রযুক্তি নয়, মানুষের মনস্তত্ত্ব। খেলোয়াড়কে প্রথমে ছোট ছোট অঙ্কে জিতিয়ে এমন একটি বিশ্বাস তৈরি করা হয় যে, এখানে নিয়মিত লাভ করা সম্ভব। সেই বিশ্বাস থেকেই ধীরে ধীরে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ শুরু করেন ব্যবহারকারীরা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সফটওয়্যারনির্ভর অ্যালগরিদম ও নিয়ন্ত্রিত গেমিং সিস্টেমের মাধ্যমে প্রায় সবাইকে হারতে বাধ্য করা হয়। অর্থাৎ শুরুতে লাভের অনুভূতি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে জেতার সুযোগ কার্যত থাকে না। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন জুয়ার ব্যবসা মূলত মানুষের দ্রুত ধনী হওয়ার আকাক্সক্ষাকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও নিম্ন আয়ের তরুণদের সহজে টার্গেট করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, ইউটিউব ভিডিও এবং ভুয়া সাফল্যের গল্প দেখিয়ে নতুন খেলোয়াড় সংগ্রহ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত বন্ধু বা আত্মীয়ের মাধ্যমেও মানুষ এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমানে ক্রিকেট, ফুটবল, ক্যাসিনো, স্লট গেম, লটারি, রুলেট, পোকার, কার্ড গেমসহ অসংখ্য বেটিং প্ল্যাটফর্ম বাংলা ভাষায় পরিচালিত হচ্ছে। ব্যবহারকারীদের জন্য সহজ ইন্টারফেস, তাৎক্ষণিক টাকা জমা ও উত্তোলনের সুবিধা এবং বিভিন্ন বোনাস অফারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। অনেক ওয়েবসাইটে এমনকি গ্রাহকসেবাও বাংলা ভাষায় দেওয়া হচ্ছে, যাতে ব্যবহারকারীরা সহজেই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।

অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, দেশব্যাপী অভিযানে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত এক হাজারের বেশি এমএফএস এজেন্টকে শনাক্ত করা হয়েছে। এসব এজেন্টের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তাদের তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে, যাতে লাইসেন্স বাতিল ও আর্থিক জরিমানাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ইতোমধ্যে অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৫৫ হাজার এমএফএস অ্যাকাউন্টের লেনদেন স্থগিত বা ফ্রিজ করেছে। একই সঙ্গে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। 

সংসদেও সরকার জানিয়েছে, অনলাইন জুয়ার আর্থিক নেটওয়ার্ক ভাঙতে গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, একটি অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়ার পরপরই নতুন সিম, নতুন অ্যাকাউন্ট ও নতুন এজেন্ট ব্যবহার করে আবারও কার্যক্রম শুরু করে সিন্ডিকেট। ফলে শুধু এমএফএস অ্যাকাউন্ট জব্দ করে এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার মূল রয়েছে জুয়ার ওয়েবসাইট, সার্ভার ও মোবাইল অ্যাপে। এগুলো বন্ধ না করা গেলে মাঠপর্যায়ের অভিযান দীর্ঘমেয়াদে খুব বেশি কার্যকর হবে না। কারণ অধিকাংশ সার্ভার বিদেশে থাকায় দেশীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একক উদ্যোগে সেগুলো বন্ধ করা সম্ভব হয় না। 

তাদের মতে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, এমএফএস অপারেটর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। 

সন্দেহজনক ওয়েবসাইট দ্রুত ব্লক, অ্যাপ স্টোর থেকে অপসারণ, পেমেন্ট গেটওয়ে বন্ধ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির অবৈধ ব্যবহার শনাক্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে হবে।

সরকারও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে আইনি অবস্থান আরও কঠোর করেছে। সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৬ অনুযায়ী অনলাইন জুয়া পরিচালনা, অংশগ্রহণ, প্রচারণা, কিংবা এ ধরনের অ্যাপ বা ওয়েবসাইট তৈরি ও পরিচালনা, সবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদন্ড, এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, অনলাইন জুয়া কেবল অর্থ হারানোর বিষয় নয়; এটি ধীরে ধীরে এক ধরনের আচরণগত আসক্তিতে পরিণত হয়। মস্তিষ্কে দ্রুত লাভের প্রত্যাশা তৈরি হওয়ায় খেলোয়াড় বারবার একই খেলায় ফিরে আসেন। ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় আরও বেশি টাকা বিনিয়োগ করতে গিয়ে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এর ফলে পরিবারে অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনে বিপর্যয় এবং চরম ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করেই এই ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। কারণ প্রযুক্তির সহজ ব্যবহার, বেকারত্ব, দ্রুত অর্থ উপার্জনের আকাক্সক্ষা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানো, এসব কারণে তরুণরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিদিনই নতুন নতুন ডোমেইন, অ্যাপ এবং পেমেন্ট চ্যানেল চালু হচ্ছে। তাই শুধু অভিযান নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় আরও জোরদার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে অপরিচিত কোনো বেটিং অ্যাপ, টেলিগ্রাম, ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে লড়াই কেবল পুলিশের দায়িত্ব নয়। পরিবারকে সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রমে নজর রাখতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সচেতনতা বাড়াতে হবে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করতে হবে এবং গণমাধ্যমকে নিয়মিত জনসচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অবৈধ বেটিং প্ল্যাটফর্ম শনাক্ত ও বন্ধে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। 
তাদের ভাষায়, অনলাইন জুয়ার এই অদৃশ্য সাম্রাজ্য মানুষের স্বপ্নকে পুঁজি করে ব্যবসা করছে। শুরুতে কেউ কেউ সামান্য জিতলেও শেষ পর্যন্ত লাভবান হয় কেবল সিন্ডিকেট। হারায় খেলোয়াড়, ভেঙে পড়ে পরিবার, আর বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় অর্থনীতি। তাই এখনই কার্যকর, সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে অনলাইন জুয়ার এই মহাফাঁদ ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) ভোরের ডাককে বলেন, অনলাইন জুয়ার বিস্তার রোধে দেশজুড়ে নিয়মিত অভিযান চলছে। শুধু এজেন্ট গ্রেপ্তার নয়, জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপ বন্ধেও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে এবং এ অপতৎপরতা দমনে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। 


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: