সকল গুঞ্জনকে সত্যি করে অবশেষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণের বিষয়টি জানাতে বিকেল ৫টায় জাতীয় সংসদ ভবনে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেছেন স্পিকার। তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্র আমার কাছে জমা দিয়েছেন। তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।
তিনি আরও বলেন, স্পিকারের শপথের সময় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়ে রেখেছিলাম। যদি প্রয়োজন হয় সেই শপথ অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করব। একইভাবে ডেপুটি স্পিকারও শপথের সময় স্পিকারের শপথ নিয়ে রাখেন বলে জানান হাফিজ উদ্দিন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস তালুকদারসহ সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এদিকে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্রে কী উল্লেখ করা হয়েছে, তা নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদের স্পিকার বরাবর লেখা শুক্রবার (২৪ জুলাই) মো. সাহাবুদ্দিন স্বাক্ষরিত ওই পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার দায়িত্ব পালন, দেশের সাংবিধানিক পরিস্থিতি এবং পদত্যাগের কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
পদত্যাগপত্রে তিনি লিখেছেন, ‘আমি মো. সাহাবুদ্দিন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ খ্রি. সনের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করি এবং অদ্যাবধি নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকটের সৃষ্টি হয়।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘সাংবিধানিক সংকট থেকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে আমি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করি। অতঃপর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শক্রমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে পরামর্শক্রমে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে।’
নিজের ভূমিকার কারণে সাংবিধানিক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে উল্লেখ করে তিনি পদত্যাগপত্রে লিখেছেন, ‘আমার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।’
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বর্তমান সরকার গঠিত হয়ে দেশ পরিচালনা করছে। বর্তমানে সরকারি দল ও বিরোধী দল গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে।
শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা জানিয়ে মো. সাহাবুদ্দিন লিখেছেন, ‘আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানীং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় Autonomic Neuropathy নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। রোগসমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন। এমতাবস্থায়, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ হতে পদত্যাগ করছি।’
উল্লেখ্য, মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। এরপর থেকেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছিল জামায়াত ও এনসিপির নেতাকর্মীরা। এ দাবিতে গণ-অভ্যুত্থানের পর একাধিক আন্দোলনও হয়েছে।