জুলাই থেকে অক্টোবর (আষাঢ় থেকে কার্তিক মাস) ইলিশের ভরা মৌসুম। এবারের বর্ষা মৌসুমে বাজারগুলোতে মাছের আমদানি বেড়েছে। দু-চারটি দোকানে রুপালি ইলিশ সারিবদ্ধভাবে সাজানো থাকলেও হাঁকা হচ্ছে আকাশছোঁয়া দাম। ফলে বিক্রেতার হাঁকডাক শুনে দরদাম করলেও খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে বেশিরভাগ ক্রেতাকে। চাঁদপুর, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঢাকায় ইলিশ আসছে। তবে, সরবরাহ বাড়লেও দাম ক্রেতাদের নাগালে আসছে না।
এদিকে ইলিশের দাম ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্য আনতে মাঠে নামছে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিকার অধিদপ্তর। সংস্থাটি ইলিশের বাজার নিয়ে এরই মধ্যে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। দাম নিয়ন্ত্রণে শিগগিরই মাঠে নামবে সংস্থাটি। ক্রেতাদের অভিযোগ, মাছের সরবরাহ যথেষ্ট হলেও ব্যবসায়ীরা দাম কমাচ্ছেন না। বাজার সিন্ডিকেটের কারণেই বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে ইলিশ।
আর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, একে তো সরবরাহ কম, অন্যদিকে রয়েছে চাঁদাবাজি ও ডিজেলের বাড়তি দাম। এর সঙ্গে রয়েছে সিন্ডিকেট। সব মিলে ইলিশের দাম নাগালের বাইরে চলে গেছে।
রাজধানীতে ইলিশ পাওয়া গেলেও চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলার বিভিন্ন মাছের আড়তে তেমন একটা দেখা মিলছে না। বিগত বছরের তুলনায় মাছের আমদানি কম। তবে আবাহওয়া স্বাভাবিক হলে মাছের আমদানি বাড়বে বলে প্রত্যাশ্যা স্থানীয় আড়তদারদের। অথচ ইলিশের ভরা মৌসুম চলছে। তবুও নদ-নদীতে জেলেদের জালে তেমন ইলিশ ধরা পড়ছে না।
বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে সমুদ্রে যাওয়া জেলেদের জালে গত কয়েকদিন ধরে মোটামুটি ভালোই ইলিশ ধরা পড়ছে। কিন্তু বড় ইলিশ তুলনামূলক কম হলেও ছোট ইলিশ এবং জাটকা পরিমাণে বেশি।
আড়তদারদের দাবি, এ সময়ে সাধারণত বাজারে ইলিশের জোগান অনেক বেশি থাকে। কিন্তু নদীগুলো মাছের আকাল পড়েছে। প্রত্যাশিত সরবরাহ মিলছে না। ফলে চাহিদা থাকলেও বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি ঠেকানো যাচ্ছে না।
আড়তদার মোস্তফা জানান, বর্ষা মৌসুমে মাছের আমদানি বেশি থাকার কথা থাকলেও বৈরী আবহাওয়ায় জেলেরা নদী/সাগরে যেতে পারছে না। দুই একজন জেলে মাছ ধরতে গেলেও আশানুরূপ মাছ মিলছে না। ফলে মাছের বাজার কিছুটা চড়া।
গতকাল একাধিক বাজার ঘুরে আকারভেদে ইলিশের দামের যে চিত্র দেখা গেছে তাতে, এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ সবচেয়ে দামি। প্রতি কেজি ২ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ২৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দেড় কেজির বেশি হলে দাম আরও বেশি, তবে এই সাইজের ইলিশ বাজারে খুবই কম। ৭০০ গ্রাম থেকে ৮০০ গ্রামের ওজনের ইলিশ এই সাইজের ইলিশের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। কেজিপ্রতি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মধ্যবিত্ত ক্রেতারা এই সাইজই বেশি কেনেন। ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বাজারে এই ছোট সাইজের ইলিশ কেজিপ্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
বাজারে ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও কিনছেন কম মানুষ। দাম দেখেই অনেকে ফিরে যাচ্ছেন। তাদেরই একজন সিদ্দিক হোসেন। পেশায় শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘ইলিশ মাছ কিনতে আসছিলাম। যে দাম, কেনার অবস্থা নাই। তাই অন্য মাছ দেখছি।’
মিরাজ নামের আরেকজন ক্রেতা বলেন, ‘গত বছর এই সময় জাটকার কেজি ছিল ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। বড় ইলিশ কেজি ছিল হাজারের মধ্যে। আর এখন যে দাম, এতে গরিবের পাতে ইলিশ উঠবে না।’
ঢাকার মৎস্য আড়ত মালিকদের সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, আগে নদ-নদীতে প্রচুর ইলিশ মিলত। এসব ইলিশ স্থানীয় বাজারে প্রান্তিক জেলেরা সরাসরি বিক্রি করতেন। এখন প্রান্তিক আড়তে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য অনেক বেশি। কম দামে মাছ পাওয়া যায় না। আবার ঢাকায়ও বাজারজাত খরচ ধাপে ধাপে বেড়েছে।
তিনি বলেন, বরফের দাম দ্বিগুণ হয়েছে গত তিন বছরে। আড়তে শ্রমিকরা কম খরচে কাজ করেন না। বাজারের ইজারা, ভাড়া এসব বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে।
এ ব্যাপারে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ, একোয়াকালচার ও মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, এখন ইলিশের মৌসুম।
কিন্তু প্রচুর পরিমাণে ইলিশ যে ধরা পড়ছে, বিষয়টা এমন নয়। নদ-নদীতে ইলিশ খুবই কম ধরা পড়ছে। এর পাশাপাশি বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগরেও ঠিকমতো মাছ ধরতে পারছেন না জেলেরা। তাই বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম। এ কারণে দাম বেশি।
তিনি আরও বলেন, আমরা আশা করছি বৈরী আবহাওয়া শেষে জেলেদের জালে আশানুরূপ মাছ ধরা পড়বে। জেলেরা লাভবান হবেন। তখন দামও কমবে।