‘ওরা আমাকে ধরে নিয়ে কী যেন খাওয়ালো... আমি আর বাঁচব না।’ মৃত্যুর ঠিক আগে মোবাইল ফোনে ধারণ করা একটি ভিডিওতে এমন হৃদয়বিদারক আর্তনাদ করে নিজের ওপর চালানো নির্যাতনের বর্ণনা ও অভিযুক্তদের নাম প্রকাশ করে যান জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার আব্দুল হান্নান (৪২)। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) নিহতের ছেলে আজাদুল ইসলাম বাদী হয়ে কালাই থানায় ছয়জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার পর পুলিশ এজাহারভুক্ত আসামি তহিদুল ইসলামকে (৪০) গ্রেপ্তার করেছে। অন্য আসামিদের ধরতে অভিযান চলছে।
মৃত্যুর আগে ধারণ করা ভিডিওতে হান্নান বলেন, আমি বাঁচার জন্য মওদুদ ভাইকে ফোন দিছিনু, মনজুরকে ফোন দিছিনু। আইজুল, তহিদুল, বাবুল (কাউয়ার ব্যাটা), মুসাসহ কয়েকজন মিলে আমাকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর বেঁধে রেখে কী যেন খাওয়ালো, আমি জানি না। আমি মনে হয় আর বাঁচব না।
ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, পূর্ব শত্রুতার জেরেই তার ওপর এই হামলা চালানো হয়েছে। তার ভাষ্য, এর আগে একই ব্যক্তিরা তার ভাইয়ের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করে এবং বিনা কারণে তাকে ডিবি পুলিশের হাতে তুলে দেয়। ওই ঘটনার প্রতিবাদ করায় তিনি তাদের রোষানলে পড়েন।
মৃত্যুর আগে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আকুতি জানিয়ে হান্নান বলেন, আমার একটা ছেলে আছে, ওকে সবাই দেখে রাখবেন। আমি যদি কোনো ভুল করে থাকি, আমাকে মাফ করে দিয়েন। এরপর কালেমা পাঠ করতে শোনা যায় তাকে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রবিবার (২০ জুলাই) দিবাগত রাত ২টার দিকে কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের শাইলগুন গ্রামের মশপুকরা ব্রিজসংলগ্ন মাঠে এ ঘটনা ঘটে। মাত্রাই বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে ওঁৎ পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা হান্নানের পথরোধ করে তাকে মাঠে নিয়ে যায়। সেখানে হাত-পা বেঁধে অণ্ডকোষে রশি পেঁচিয়ে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে তার মুখে বিষাক্ত পদার্থ ঢেলে দিয়ে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।
খবর পেয়ে নিহতের ছেলে আজাদুল ইসলাম তাকে উদ্ধার করে কালাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের ছেলে আজাদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তার বাবাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিনি এ ঘটনায় জড়িত সব আসামির দ্রুত গ্রেপ্তার, বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
এদিকে এলাকাবাসীর অভিযোগ, অভিযুক্তদের কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মাদক, চাঁদাবাজি, জুয়া ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত। তাদের ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না। এই হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়দের দাবি, জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
মাত্রাই ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান আম্বিয়া বেগম বলেন, নিহত আব্দুল হান্নানের ভিডিওতে দেওয়া বক্তব্য আমি দেখেছি। সেখানে তিনি যেসব অভিযোগ করেছেন, বাস্তবে ঘটনার সঙ্গে তার মিল রয়েছে বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। আমি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।
কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। ইতোমধ্যে একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।