জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ৩১ দফার অঙ্গিকার থেকে সরে এসেছে। নির্বাচনের আগে বিএনপি বলেছিলো জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে, দেশে সংস্কার নিয়ে আসবে। নির্বাচনের পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও এখনও একটিও বাস্তবায়ন করেনি, বরং তারা প্রতিটি অঙ্গিকার থেকে সরে আসছে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিকাল ৫টায় নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলা সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ উপলক্ষে আয়োজিত পথসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
আখতার হোসেন বলেন, এই দেশে যখন শেখ হাসিনার জুলুম চলছিল, মানুষকে গুম ও হত্যা করা হচ্ছিল, আয়নাঘরে বন্দি করা হচ্ছিল, পিলখানা হত্যাকান্ডের নামে মানুষকে পঙ্গু করা হচ্ছিল, শাপলা চত্বরে শিক্ষার্থী ও আলেমওলায়মাদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছিল।
কোঠা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক সংস্কার আন্দোলন, মতিবিরোধী আন্দোলন সহ প্রত্যেকটি ন্যায আন্দোলনকে নির্মমভাবে প্রতিহত করছিল- ঠিক সেই সময় দেশের মানুষ দুইটি কথা ভাবতে এক হাসিনা অপশাসন থেকে মুক্ত হওয়া দুই এই ধরণের শাসন বাংলাদেশে কখনো ফিরে না আসে একারণে রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কার করা। দেশের সাধারণ মানুষরা তাদের সেই আঙ্খাকা জাগিয়ে রেখেছিল।
তারা ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য গণভোটে অংশগ্রহণ করে সত্তর শতাংশ মানুষ মতামত দিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগের বিষয় সেই সংস্কারের গণভোটকে এখন আর মানা হয় না।
তিনি উল্লেখ করে বলেন, বিএনপির নেতৃবৃন্দ তাদের সমমনা দলের নেতাদেরকে নিয়ে গতকাল(সোমবার) একটি নৈশ্যভোজের আয়োজন করেছিল। সেই নৈশ্যভোজের আয়োজন শেষে বিএনপির নেতৃবৃন্দ বলছেন তারা ৩১ দফা বাস্তবায়ন করবেন। কিন্তু বিএনপির সরকার তাদের ৩১ দফার কমিটমেট সেখান থেকেও তারা সরে এসেছে।
তিনি কথাটি আবারও রিপিট করে বলেন, বিএনপি শুধু গণভোটকে অস্বীকার নয়, তাদের দেয়া ৩১ দফা অঙ্গিকারের মধ্যে তারা সংবিধানের সংস্কারের কথা বলেছিল, কিন্তু এখন তারা সংবিধানের সংস্কার চায় না।
৩১ দফা অঙ্গীকারে তারা ভোটাধিকার নিয়ে কথা বলেছিলো, আর ভোটাধিকারকে যদি সুষ্ঠ করতে হয় তাহলে নতুন ফরমুলায় তত্বাবধায়ক সরকার লাগবে। কিন্তু তারা নতুন ফরমুলায় তত্বাবধায়ক সরকার চায় না। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থেকে নিজের মতো করে বিচার বিভাগ থেকে লোক নিয়ে এসে তত্বাবধায়ক সরকার দিয়ে তাদের আইন পাশ করিয়ে নিতে চায়। বিচার বিভাগের দিকে আমাদের হতাশার মতো তাকিয়ে থাকতে হয়। বিচার বিভাগের যে সুষ্ঠ নিয়োগের কথা ছিল, সুষ্ঠভাবে বিচারপতি নিয়োগের কথা ছিল সেই আইনটিও তারা সংসদে পাস করে নাই। তারা সংসদে তা বাতিল করে দিয়েছে।
দেশের অর্থনীতির পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে আখতার হোসেন বলেন, দেশের অর্থনীতির খাতায় ঋনের বোঝা বেড়েই চলেছে। বাজেট ঘোষণার আগেই জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। একারণে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংস্কার হওয়া জরুরি হয়েছে। আমি শুধু একটি কথা বলতে চাই আপনারা সরকারের কাছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করুন।
আখতার হোসেন দৃঢ়তার সাথে বলেন, জনগণ এনসিপির প্রতি আস্থা রেখেছেন। আমরা নতুন দল অল্প আসনে নির্বাচন করেও আপনাদের ভোটের মাধ্যমে সংসদে যেতে পেরেছি। সেই আশাবাদের জায়গা থেকে সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও এনসিপির সর্মথিত প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। আমরা আর পুরাতন বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাই না। আমরা নতুন বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হতে চাই। যে বাংলাদেশে সাধারণ মানুষদের হতাশায় ভুগতে হবে না। যেখানে আপনাদের ভোটাধিকার থাকবে, যেখানে প্রশাসনকে কড়া আয়তে রাখা হবে না, তারা স্বাধীনভাবে দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করবে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যার সীমান্ত থাকবে শতভাগ সুরক্ষিত। এমন একটি দেশ চাই যেখানে সব ধর্মের মানুষ কাধে কাধ মিলিয়ে একসাথে চলাফেরা করবে।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তার বক্তব্যে বলেন, উত্তরবঙ্গ দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। নেই পর্যাপ্ত শিল্পকারখানা, নেই ভালো স্বাস্থ্যব্যবস্থা চিকিৎসা। উত্তরবঙ্গের মানুষকে অবহেলিত করে রাখা হচ্ছে। তাই জুলাই গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ এই সংস্কারের টিকা দিতে হবে।
পথসভায় এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, আমরা দেখছি এখানে জামায়াতের এমপি থাকলেও টেন্ডার হতে না হতে সরকারি প্রত্যেকটি অফিসে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলের অত্যাচারে কর্মকর্তা কর্মচারী ঠিকমতো অফিস করতে পারেনা। ওখানে আবার কিছু কর্মকর্তা কর্মচারী নিজেকে সরকারি কর্মচারীর চেয়ে বিএনপির লোক হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। তারা তাদের সঙ্গে মিলে টেন্ডারবাজি ও লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এসব অনিয়ম প্রতিহত করতে হবে। মনে রাখবেন জুলুম যদি শুরু হয় তার বিরুদ্ধে যদি প্রতিবাদ না করেন কথা না বলেন টেনে না ধরেন, সেটা এমন এক পর্যায়ে যাবে সেখান থেকে আর ফিরে আসার উপায় থাকবেনা। আমরা সালাউদ্দিন আহমেদকে মনে করতে চাই যে তাকে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমরা মনে করতে চাই তিমি জুলুমের শিকার হয়েছিলেন। আমরা আরও মনে করতে চাই তারেক রহমানকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে দেশের বাহিরে পাঠানো হয়েছিল। আমরা মনে করতে চাই তিনিও সতেরো বছর জুলুমের শিকার হয়েছেন। কিন্তু যে মানুষ পঞ্চাশ পার্সেন্ট ভোট দিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় পাঠিয়েছে সে মানুষ সত্তর পার্সেন্ট ভোট দিয়েছে গণভোটের পক্ষে, জুলাই সনদের পক্ষে ও সংস্কারের পক্ষে । যে আদেশের ফলে বিএনপি নির্বাচিত সরকার হয়েছে। যে আদেশের ফলে গণভোট হয়েছে সেটি নাকি অবৈধ।
আমরা জনাব সালাউদ্দিন আহমেদ ও তারেক রহমানকে শুধু একটা কথা বলতে চাই, এক মায়ের যদি একসঙ্গে দুই জমজ সন্তান হয় এক সন্তান বৈধ আরেক সন্তান অবৈধ হতে পারেনা। যদি সংস্কার অবৈধ হয়, জুলাই সনদ যদি অসাংবিধানিক হয় তাহলে সালাউদ্দিন আহমেদ, তারেক রহমান বিএনপি সরকার সবকিছু অবৈধ। আপনারা যদি গণভোট বাস্তবায়ন না করেন তাহলে আগামীর বাংলাদেশে এই বিএনপির কবর রচিত হবে।
সারজিস আলম আরও বলেন, বিএনপি সরকার কিছুদিন আগে আট হাজার কোটি টাকার একটা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। এই প্রকল্প টা নিয়েছেন শুধুমাত্র বিএনপির এমপিদের জন্য। এখন বিএনপি সরকার ও তারেক রহমানের কাছে আমাদের প্রশ্ন বিএনপি যে বর্তমানে সরকারে আছে তারা কি শুধু ধানের শীর্ষের সরকার নাকি যেখানে শুধু বিএনপি জিতেছে তিনি সেখানের সরকার। নাকি তারা বাংলাদেশের সরকার এবং ৩০০ আসনের সরকার এই উত্তরটা তাদের দিতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা একটু প্রশাসনের দিগে নজর দিতে চাই। গনঅভ্যুত্থানের আগে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বলতো রয়ের হেড কোয়ার্টার ভারতে ও ভারতের গোয়েন্দার সংস্কার আরেকটা হেড কোয়ার্টার আছে ক্যান্টনমেন্টে। বিএনপির সরকারকে বলতে চাই আমার এই সেনাবাহিনী আমার সার্বভৌমত্বের প্রতীক, শক্তির প্রতীক, ঐতিহ্যের প্রতীক সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশের সবথেকে শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে৷
পথসভায় আরও বক্তব্য দেন রংপুর বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও কুড়িগ্রাম-২ (সদর, রাজারহাট ও ফুলবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিকুর রহমান মুজাহিদ, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ও দিনাজপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক আবু সাঈদ লিওন সহ দলের অন্যান্য নেতারা। জলঢাকা পথসভা শেষে রাতে তারা নীলফামারী জেলা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পথসভায় অংশগ্রহণ করে।