হাজারো গাছের জনক আজ মামলার আসামি

মোকছেদুল মমিন মোয়াজ্জেম, দিনাজপুর

সারাদেশ

দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে স্বেচ্ছায় বৃক্ষরোপণ করে পরিচিতি পাওয়া এক বৃক্ষপ্রেমীর বিরুদ্ধে বন বিভাগের দায়ের করা মামলা ঘিরে এলাকায়

2026-07-21T12:02:28+00:00
2026-07-21T12:02:28+00:00
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
বিরামপুরে বন বিভাগের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ
হাজারো গাছের জনক আজ মামলার আসামি
মোকছেদুল মমিন মোয়াজ্জেম, দিনাজপুর
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ১২:০২ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে স্বেচ্ছায় বৃক্ষরোপণ করে পরিচিতি পাওয়া এক বৃক্ষপ্রেমীর বিরুদ্ধে বন বিভাগের দায়ের করা মামলা ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। 

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বন বিভাগের এক কর্মকর্তার চাহিদামতো ঘুষ না দেওয়ায় পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে লুৎফর রহমানকে। শুধু তাই নয়, মামলায় তাঁর কলেজপড়ুয়া দুই ছেলেকেও আসামি করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।

অন্যদিকে বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। তাই আদালতের মাধ্যমেই এর নিষ্পত্তি হবে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিরামপুর উপজেলার ৩ নম্বর খানপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ শাহাবাজপুর গ্রামের বাসিন্দা লুৎফর রহমান পেশায় একজন ট্রাকচালক। তবে জীবিকার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিজের উদ্যোগে রাস্তার ধারে, খালি জায়গা ও জনসাধারণের ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন স্থানে ফলজ ও বনজ গাছের চারা রোপণ করে আসছেন।

স্থানীয়দের দাবি, গত এক দশকে তিনি পাঁচ হাজারেরও বেশি গাছ লাগিয়েছেন। এ কারণেই এলাকায় তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে পরিচিত।


এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, দক্ষিণ শাহাবাজপুর মৌজার একটি খোলা জায়গা প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয়দের ফুটবল খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মাঠের চারপাশে কোনো ছায়াদার গাছ না থাকায় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে পাওয়া ২০টি আমগাছের চারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পরামর্শে মাঠের পাশে রোপণ করেন লুৎফর রহমান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গাছ লাগানোর প্রায় তিন মাস পর তৎকালীন প্রয়াগপুর বিট কর্মকর্তা মাহমুদার রহমান লুৎফর রহমানকে অফিসে ডেকে বন বিভাগের জমিতে গাছ লাগানোর অভিযোগ তোলেন এবং বিষয়টি মীমাংসার কথা বলে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। লুৎফর রহমান ওই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে একই বছরের আগস্ট মাসে বদলির আগে তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় লুৎফর রহমানকে প্রধান আসামি এবং তাঁর কলেজপড়ুয়া দুই ছেলে হাসেন ও হোসেনকে আসামি করা হয়।

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, বন বিভাগের প্রায় ২০ শতাংশ জমিতে থাকা চারা গাছ কেটে সেখানে ধান চাষ করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সরেজমিনে দক্ষিণ শাহাবাজপুর মৌজার ৫৬৬২ নম্বর দাগ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে স্থানীয় উদ্যোগে একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট চলছিল। মাঠজুড়ে ছিল দর্শকদের ভিড়। মাঠের চারপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আমগাছগুলো বেশ বড় হয়ে উঠেছে এবং সেগুলোর ছায়ায় বসেই খেলা উপভোগ করছিলেন দর্শনার্থীরা।

এলাকাবাসী জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই মাঠটি খেলাধুলার জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে সেখানে আগে কখনো গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং লুৎফর রহমানের লাগানো আমগাছগুলো এখন মাঠের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি খেলোয়াড় ও দর্শকদের ছায়া দিচ্ছে।


স্থানীয় ফুটবল টুর্নামেন্টের রেফারি বকুল হোসেন বলেন, লুৎফর রহমান আমাদের এলাকার একজন প্রকৃত বৃক্ষপ্রেমী। প্রায় ২০ বছর আগে গ্রামের প্রবেশপথে তিনি নিজ উদ্যোগে তালগাছ লাগিয়েছিলেন। আজ সেই গাছগুলো গ্রামের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষের উপকারে আসছে। যেখানে খালি জায়গা পান, সেখানেই গাছ লাগানোর চেষ্টা করেন। ফুটবল মাঠের পাশেও তিনি আমগাছ লাগিয়েছেন, যা এখন সবার কাজে লাগছে। তাঁর বিরুদ্ধে গাছ কাটার অভিযোগ আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়।

কুশাগাড়ি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হাকিম বলেন, লুৎফর রহমান গাছ লাগানোর মানুষ, গাছ কাটার মানুষ নন। কেউ গাছের ডাল কাটলেও তিনি প্রতিবাদ করেন। এমন একজন মানুষের বিরুদ্ধে গাছ কেটে ধান চাষের অভিযোগ আমরা বিশ্বাস করি না।

নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বৃক্ষপ্রেমী লুৎফর রহমান বলেন, উপজেলা কৃষি অফিস থেকে পাওয়া ২০টি আমগাছ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পরামর্শে মাঠের পাশে লাগিয়েছিলাম। পরে বিট কর্মকর্তা আমার কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। আমি টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় আমার এবং আমার দুই ছেলের নামে গাছ চুরি ও ধান চাষের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। অথচ যে জায়গার কথা বলা হয়েছে, সেটি প্রায় তিন ফুট উঁচু। সেখানে ধান চাষ করা বাস্তবসম্মত নয়। আমি ন্যায়বিচার চাই।

খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চিত্ত রঞ্জন শাহা বলেন, ফুটবল মাঠের চারপাশে গাছ লাগানোর আগে লুৎফর রহমান আমার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। আমি তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিলাম। পরে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে শুনে বিস্মিত হয়েছি। বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন প্রয়াগপুর বিট কর্মকর্তা মাহমুদার রহমান মুঠোফোনে বলেন, আমি বর্তমানে ঢাকায় কর্মরত। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। তাই এ বিষয়ে আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এ কথা বলেই তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

বিরামপুর বন বিভাগের চরকাই রেঞ্জ কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আমি চার মাস আগে এখানে যোগদান করেছি। মামলার বিস্তারিত বিষয়ে অবগত নই। যেহেতু বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন, তাই আদালতেই এর নিষ্পত্তি হবে।

বিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিনা খাতুন বলেন, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কেউ আমাকে লিখিত বা মৌখিকভাবে অবহিত করেননি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জানানো হবে।

এ ঘটনায় এলাকায় নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা চলছে। স্থানীয়দের দাবি, একজন বৃক্ষপ্রেমীকে হয়রানিমূলক মামলায় জড়ানো হয়েছে।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: