দীর্ঘ সময় রাজপথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিএনপির সঙ্গে আন্দোলন করেছে যুগপৎ শরিকরা। ত্রয়োদশ নির্বাচনে পর্যাপ্ত আসন সমঝোতা ও ক্ষমতায় আসার পর ‘একলা চলো নীতি’ অবলম্বনে শরিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অভিমান পুঞ্জীভূত হয়েছে। সরকার গঠনের পর আজ সোমবার প্রথমবারের মতো মিত্রদের সঙ্গে বৈঠক ও নৈশভোজ করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সন্ধ্যায় রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা সরকার প্রধানের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনা করবেন। এর মধ্যে প্রশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার হিস্যা, জোটের অভ্যন্তরীণ দূরত্ব ঘুচানো, সরকারের ৫মাসের কর্মকান্ডসহ নানা বিষয় আলোচনার টেবিলে উঠে আসবে বলে জানিয়েছেন শরিক দলের শীর্ষ নেতারা।
একসাইে ১৭ বছর রাজথে, তবে কেন দরত্ব: দীর্ঘ ১৭ বছর একসাথে রাজপথে আন্দোলন করলেও এবারের জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগমুহর্তে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ শরিকদের দুরত্ব তৈরি হয়। সরকার গঠনের পর এই দুরত্ব আরো জমাট বাধে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ৪২টি শরিক রাজনৈতিক লের মধ্যে মাত্র ১১টি দলকে ১৬টি আসন ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি। নির্বাচনে শরিকরে মধ্য থেকে মাত্র ৩ জন জয়ী হতে পেরেছেন। গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়ে সাকি, গণঅধিকার পরিষরে নুরুল হক নুর এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) আন্দালিব রহমান পার্থ। এ ছাড়া দল ছেড়ে বিএনপিতে আসা ববি হাজ্জাজও জয়ী হয়ে সংসে গিয়েছেন। শরিকদের মধ্যে কেবল সাকি ও নুরকে মন্ত্রিসভায় রাখা হলেও অধিকাংশ দল এখনো সরকার কিংবা কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব পায়নি।
যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের প্রধান অভিযোগ-নির্বাচনের পর বিএনপি অনেকটা ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ করছে। দীর্ঘ দেড় দশক ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নির্যাতিত হয়েও সরকার গঠনের পর তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি বলে মনে করছেন জোটের শরিকরা। রাজপথের লড়াকু এই মিত্ররা এখন কেবল ‘রাস্তার সঙ্গী’ হয়ে থাকতে রাজি নন; তারা সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনার কর্মপরিকল্পনায় সরাসরি ভূমিকা রাখতে চান।
বৈঠকের প্রাক্কালে একাধিক শরিক নেতা জানিয়েছেন, তারা আজ প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নিজেরে অংশীদারিত (হিস্যা) জোরালোভাবে উত্থাপন করবেন। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি (প্রশাসন), ক্রীড়া সংস্থা এবং বিভিন্ন অধিদপ্তর, সরকারি উন্নয়ন কমিটিতে শরিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার সুনির্ষ্টি প্রস্তাব দেওয়া হবে। তাদের অভিযোগ, কেন্দ্র থেকে কিছুটা যোগাযোগ থাকলেও তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপি একক আধিপত্য বজায় রাখছে, যেখানে মিত্রদের কোনো স্থান নেই।
ইসলামি লগুলোর পুঞ্জীভূত ক্ষোভ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় বামপন্থী ও তরুণ নেতাদের গুরুত্ব দেওয়া হলেও ইসলামি মূল্যবোধের দলগুলোকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইসলামি মূল্যবোধের শক্তি হওয়া সত্ত্বেও বিএনপি আমাদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারেনি। আমরা আশা করেছিলাম তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণের মাধ্যমে চমক সৃষ্টি করবেন, কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
বাংলাশে জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ও ভোলা-১ আসনের সংস সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ ভোরের ডাককে বলেন, আজ প্রধানমন্ত্রী দলগুলের সঙ্হে বসবেন এটা খুবই ভালো খবর। আমরা দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে আছি। সরকার গঠনের পর দলটি নানা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এসবে কিছু পরামর্শ ও প্রস্তাবনা দেব।
১২ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ও জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার ভোরের ডাককে বলেন, বিএনপিসহ আমরা অনেকগুলো দল একসাথে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি। এখনো রাষ্ট্রবিরোধীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলমান। পুরোনো জোটদের মধ্যে ফাটল না রেখে আরও বেশি ঐক্য বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করতে তারেক রহমানকে অনুরোধ করবো।
গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা ও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ভোরের ডাককে বলেন, আজ তারেক রহমান আমাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও নৈশভোজ করবেন। দীর্ঘদিন একসাথে লড়াই করেছি, কিন্তু সরকার গঠনের পর বিএনপি শরিকদের রেখে হাটছে। আমাদের সঙ্গে সম্পর্কটা কি শুভেচ্ছা বিনিময় ও নৈশভোজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ াকবে নাকি বিএনপি ‘একলা চলো নীতি’ থেকে সরে আসবে এমন প্রশ্ন করবো।
তিনি আরও বলেন, আমরা সরকারের ৫ মাসের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষন করেছি। তারা কিছু জায়গায় সফল, কিছু জায়গায় খাদের কিনারে। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা সফল হলেও রাজনৈতিকভাবে তারা এখনো সামঞ্জস্যতা আনতে পারেনি, সফল হয়নি। আজকের বৈঠকে এ নিয়েও কথা বলবো। গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করতে আমরা সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই।
১২-লীয় জোটের মুখপাত্র ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব শাইখুল হাদিস ড. গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম বলেন, যুগপৎ আন্দোলনে দীর্ঘ সময় রাজপথে থাকার পর সরকার গঠনের পর অনেকের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আমরা চাই সরকার পরিচালনায় শরিকদের ভূমিকা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হোক।
শরিকরে এই দীর্ঘশ্বাসের বিপরীতে বিএনপি একে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে। দলের লিয়াজোঁ কমিটি ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমাদের সঙ্গে অনেকগুলো দল একসঙ্গে রাজপথে ছিলো। দলের সংখ্যা বেশি ও সরকারের প্রথমিকের কর্মব্যস্থতায় সবার সঙ্গে বসতে কিছুটা সময় লাগছে। আমাদের আলোচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং আমরা সবাইকে নিয়েই চলতে চাই। আমরা আমাদের নির্বাচনী ইসতেহার বাস্তবায়নে সবসময় যুগপৎ মিত্রদের সহযোগিতা চাই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ৩১ দফা গঠনের সময় কিংবা ভোটের পূর্বমুহূর্তে শরিকদের বিষয়ে বিএনপির দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষা না করলে ভবিষ্যতে বিএনপি রাজনৈতিক টানপোড়নে পড়তে হতে পারে। তাই শুধু সৌজন্য সাক্ষাতে সীমাবদ্ধ না থেকে রাজপথের সেই বিশ্বস্ততা যেন এবার রাষ্ট্র পরিচালনার নথিপত্রেও প্রতিফলিত হয়।
আজকের এই যমুনা-বৈঠকে প্রায় ১৫০ জন নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং প্রতিটি দল থেকে ৫ জনের তালিকা নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়।