গোলের বন্যা, নাটকীয় মোড় আর রোমাঞ্চে ভরা এক অবিশ্বাস্য লড়াই। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিয়ে ১০ গোলের থ্রিলারে ফ্রান্সকে ৬-৪ ব্যবধানে হারিয়েছে ইংল্যান্ড। রুদ্ধশ্বাস এই জয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শেষ করল থ্রি লায়ন্সরা, আর শেষ পর্যন্ত হতাশা নিয়েই মাঠ ছাড়তে হলো ফরাসিদের।
বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় যেন নিজেদেরই হারিয়ে ফেলেছিল ফ্রান্স। অন্তত প্রথমার্ধে তাদের নিয়ে যে ছেলেখেলায় মেতে ওঠে ইংল্যান্ড, তাতে তেমন ধারণাই মেলে। তবে চার গোল হজমের পর, ঘুরে দাঁড়িয়ে লড়াই জমিয়ে তুলল ফরাসিরা। দারুণ দুটি রেকর্ডের দেখাও মিলল। যদিও শেষ পর্যন্ত হার এড়াতে পারল না তারা। বুকায়ো সাকার হ্যাটট্রিকে শেষটা জয়ে রাঙাল টমাস টুখেলের দল।
মায়ামি গার্ডেন্সে শনিবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে হলো গোলের উৎসব। চাপহীন ম্যাচের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ৬-৪ গোলে জিতল ইংল্যান্ড।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ এটি। পেছনে পড়ে গেল ১৯৫৮ সালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ফ্রান্সের ৬-৩ গোলে জেতা ম্যাচ।
আর ১৯৬৬ সালে একমাত্র শিরোপা জয়ের পর, বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সেরা সাফল্য এটি। আগে দুইবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে হেরেছিল তারা- ১৯৯০ সালে ইতালির বিপক্ষে ও ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে।
সাকার হ্যাটট্রিকের পাশাপাশি ইংল্যান্ডের অন্য তিন গোলদাতা হলেন ডেক্লান রাইস, এজরি কন্সা ও জুড বেলিংহ্যাম। ফ্রান্সের হয়ে দুটি গোল করে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েন কিলিয়ান এমবাপে। তাদের বাকি দুই গোলদাতা বাহডলে বাহকোলা ও উসমান দেম্বেলে।
দুই দলই শুরুর একাদশে সাতটি করে পরিবর্তন এনে খেলতে নামে। যারা টুর্নামেন্টে খুব বেশি খেলার সুযোগ পাননি, ইংল্যান্ডের সেই সব ফুটবলাররা শুরু থেকেই চাপ তৈরি করে। সঙ্গে পাল্টা আক্রমণ করতে থাকে ফ্রান্স।
ইংল্যান্ড বল দখলে একটু এগিয়ে থাকলেও, গোলের জন্য দুই দলই সমান ১৯টি করে শট নেয়। ইংলিশরা ১১টি আর ফরাসিরা ৯টি লক্ষ্যে রাখতে পারে।
ম্যাচের তৃতীয় মিনিটে দ্বিতীয় আক্রমণেই এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের একটা ভুল পাস দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ছুটে যান রাইস, ডি-বক্সের বাইরে তাকে কেউ চ্যালেঞ্জ না জানানোয় প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে জোরাল শটে ঠিকানা খুঁজে নেন আর্সেনাল মিডফিল্ডার।
বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় দ্রুততম গোলের কীর্তি গড়লেন রাইস, দুই মিনিট ১৪ সেকেন্ডে। দেশটির দ্রুততম গোলের রেকর্ড ব্রায়ান রবসনের, ১৯৮২ আসরে ফ্রান্সের বিপক্ষেই ২৮ সেকেন্ডে।
একাদশ মিনিটে প্রথম ভালো সুযোগ তৈরি করে ফ্রান্স। দেজিরে দুয়ের জোরাল শট ঝাঁপিয়ে ঠেকিয়ে দেন জর্ডান পিকফোর্ড। পরের মিনিটেই পাল্টা আক্রমণে জালে বল পাঠান বুকায়ো সাকা, তবে তিনিই অফসাইডে ছিলেন।
দ্বিতীয় গোলের জন্য অবশ্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি ইংল্যান্ডকে। ১৮তম মিনিটে রাইসের কর্নারে সবার ওপরে লাফিয়ে হেডে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন সেন্টার-ব্যাক কন্সা।
২৮তম মিনিটে ব্যবধান কমানোর সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি এমবাপে। সতীর্থের পাস ধরে ডি-বক্সে ঢুকে শট নেন তিনি, বল পিকফোর্ডের পায়ে লেগেও জালের দিকে যাচ্ছিল, শেষ মুহূর্তে আটকান মার্ক গেয়ি। খানিক পর এমবাপের আরেকটি শট রুখে দেন গোলরক্ষক।
৩৭তম মিনিটে প্রতিপক্ষের আরেকটি আক্রমণ রুখে, গতিময় প্রতি-আক্রমণে ব্যবধান আরও বাড়ায় ইংল্যান্ড। এই গোলে ফরাসিদের রক্ষণের দুর্বলতাও ফুটে ওঠে।
সাকার দারুণ পাস ধরে সবাইকে পেছনে ফেলে ছুটে যান মার্কাস রাশফোর্ড, ওয়ান-অন-ওয়ানে তার শট অবশ্য পা দিয়ে আটকে দেন মাইক মিয়াঁ। এরপর বল পেয়ে সাকার নেওয়া শট রক্ষণে প্রতিহত হয়, কিন্তু তখনও ক্লিয়ার করতে পারেনি ফ্রান্স। এরপর, রাশফোর্ড আবার বল পেয়ে ছোট করে কাটব্যাক করেন এবং কোনাকুনি শটে এবার ঠিকই জাল খুঁজে নেন সাকা।
বিরতির আগেই আরেক গোল হজম করে ফ্রান্স। এবেরেচি এজের রক্ষণচোরা পাস ধরে, ডি-বক্সের মুখ থেকে নিখুঁত শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন সাকা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কখনও চার গোলে পিছিয়ে পড়েনি ফ্রান্স।
আর সব মিলিয়ে ৫৮ বছর পর, কোনো ম্যাচে প্রথমার্ধেই চার গোল হজম করল ফরাসিরা; এর আগে তাদের সবশেষ এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল ১৯৬৮ সালে, ইউরো বাছাইয়ে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে। বিরতির পর, ৯ মিনিটে দুটি গোল শোধ করে লড়াই জমিয়ে তোলে ফ্রান্স।
প্রথমার্ধে কয়েকটি সুযোগ হারানোর পর, দ্বিতীয়ার্ধে ফিরেই জালের দেখা পান এমবাপে। ৪৮তম মিনিটে মাইকেল ওলিসের পাস ডি-বক্সে পেয়ে প্রথম ছোঁয়ায় শটে আসরে নিজের নবম গোলটি করেন রেয়াল মাদ্রিদ তারকা। ছয় মিনিট পর গোল উৎসবে যোগ দেন বাহকোলা। এমবাপের পাস পেয়ে ব্যবধান আরও কমান পিএসজি ফরোয়ার্ড।
আর ৬৬তম মিনিটে ডান দিকে সতীর্থের পাস ডামি করে ছেড়ে দেন ওলিসে, বল ধরে তাকেই বাড়ান এমবাপে। এরপর ফিরতি পাস পেয়ে, ডি-বক্সে ঢুকে একজনের চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে প্লেসিং শটে রেকর্ড গোলটি করেন এমবাপে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে লিওনেল মেসির সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভেঙে নতুন করে লিখলেন এমবাপে; তার গোল এখন ২২টি, মেসির ২১টি। চলতি আসরে ১০ গোল করে চূড়ায় উঠলেন এমবাপে। আট গোল করে দুইয়ে মেসি।
একই সঙ্গে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক আসরে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ড গড়লেন ওলিসে, সাতটি। ভেঙে দিলেন ১৯৭০ আসরে কিংবদন্তি পেলের গড়া ছয় অ্যাসিস্টের রেকর্ড। ৮৭তম মিনিটে পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড এবং সফল স্পট কিকে বিশ্বকাপে প্রথম হ্যাটিট্রিকের স্বাদ পান সাকা।
বিশ্বকাপে তার গোল হলো ছয়টি। গত আসরেও তিনটি গোল করেছিলেন সাকা। জাতীয় দলের হয়ে সব মিলিয়ে তার গোল হলো ১৭টি। শেহকির বদলি নামা দেম্বেলে যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে জালে বল পাঠালে আবার ব্যবধান নেমে আসে এক গোলে। আভাস মেলে নতুন নাটকীয়তার। তবে, একক নৈপুণ্যে দারুণ এক গোলে সেটা হতে দেননি বেলিংহ্যাম।
নিজেদের সীমানায় বল পেয়ে, দ্রুত এগিয়ে ডি-বক্সে ঢুকে, দুইজনের বাধা এড়িয়ে জোরাল শটে প্রতিপক্ষের কফিনে শেষ পেরেক টুকে দেন এজের বদলি নামা বেলিংহ্যাম। আসরে এই মিডফিল্ডারের গোল হলো সাতটি। এরপরই বাজে শেষের বাঁশি। অন্যান্য ম্যাচের মতো অবশ্য এখানে পরাজিত দলের মুখ হতাশায় ঢাকেনি।
তবে, বিশ্বকাপ জয়ী কোচ দিদিয়ে দেশোঁর বিদায়টা জয়ে রাঙাতে না পারার খারাপ লাগা কিছুটা হলেও থাকল এমবাপে-দেম্বেলেদের। এই ম্যাচ দিয়েই ফ্রান্সের ডাগআউটে শেষ হলো দেশোঁর এক যুগের বেশি সময়ের পথচলা।