জাতীয় রাজনীতিতে বাড়ছে তরুণ নেতৃত্বের প্রভাব

সুজন দে

রাজনীতি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।

2026-07-18T18:03:50+00:00
2026-07-18T18:03:50+00:00
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
রাজনীতি
জাতীয় রাজনীতিতে বাড়ছে তরুণ নেতৃত্বের প্রভাব
সুজন দে
শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬, ৬:০৩ পিএম 
ফাইল ছবি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। ক্ষমতার পরিবর্তনের পাশাপাশি দৃশ্যমান হয়েছে রাজনীতির নতুন মেরুকরণ, যেখানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো তরুণ নেতৃত্বের উত্থান। যে তরুণরা প্রথমে কোটাবিরোধী আন্দোলন এবং পরে গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই এখন জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ। একই সঙ্গে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের তরুণ নেতারাও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে তরুণ নেতৃত্বের প্রভাব বাড়ছে। 

২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলন ছিল মূলত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলন। পরবর্তীতে এই আন্দোলন সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তার পরিণতি ঘটে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের একটি বড় অংশ পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করেন। 

তারা হলেন, নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, হাসনাত আবদুল্লাহ, হান্নান মাসউদ, আতিকুর রহমান মোজাহিদ ও আব্দুল্লাহ আল আমিন। এরা সবাই তুলনামূলক ভাবে তরুণ। জাতীয় সংসদে তাদের ভূমিকা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় উপস্থিতির কারণে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের প্রভাব স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে।

অন্যদিকে সরকারি দল বিএনপির মধ্যেও তরুণ নেতৃত্বের একটি শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি হয়েছে। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দল পুনর্গঠনেও নতুন প্রজন্মের নেতারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছেন। জাতীয় সংসদে দলটির নির্বাচিত তরুণ সদস্যরা যেমনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তেমনি দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গতি বাড়াতে নতুন প্রজন্মের একাধিক নেতাকে দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরসহ তরুণ নেতৃত্বকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা পালন দেখা যাচ্ছে।

বর্তমানে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা প্রায় প্রতিদিনই সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। সংবাদ সম্মেলন, টকশো, সেমিনার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব ক্ষেত্রেই তাদের সক্রিয় উপস্থিতি চোখে পড়ছে। বিশেষ করে ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তরুণ রাজনীতিকদের বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেও নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের উত্থান লক্ষণীয়। দলটির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতা এবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে উঠে আসা নেতারা এখন দলটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী ভিপি ও জিএসরা এখন আর শুধু ক্যাম্পাসভিত্তিক নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ নেই। তারা নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অধিকার, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও ক্যাম্পাস রাজনীতির বিভিন্ন ইস্যুতে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাতেও প্রভাব বিস্তার করছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নীতিগত সংলাপ, জাতীয় ইস্যুতে প্রকাশ্য অবস্থান, গণমাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনমত গঠনের মাধ্যমে তারা নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

দীর্ঘ বিরতির পর ছাত্র সংসদ নির্বাচন পুনরায় চালু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবারও জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যেখানে বর্তমানের ভিপি-জিএসদের অনেকেই ভবিষ্যতে দেশের মূলধারার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা তৈরি করেছেন।

অন্যদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মীও দেশের বিভিন্ন স্থানে আকস্মিক মিছিল বা বিক্ষোভের চেষ্টা করছেন। এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশই তরুণ। ফলে রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাতেও তরুণরাই এখন সবচেয়ে দৃশ্যমান শক্তি হিসেবে সামনে আসছেন।

এ ব্যাপারে সাবেক মন্ত্রী জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণদের এই উত্থান একদিকে যেমন ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে এনেছে। নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভ্যস্ত এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে দক্ষ। তবে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রেও তাদের আরও পরিপক্ব হতে হবে। যদি এই প্রজন্ম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে শেখে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার দিকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতি আরও ইতিবাচক ধারায় এগোতে পারে।

দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদ ১২ দলের সমন্বয়ক সাবেক মন্ত্রী মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছাত্রনেতারা বিভিন্ন সময়ে জাতীয় নেতৃত্বে এসেছেন। তবে এবারের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। কারণ, এই প্রজন্ম কেবল রাজনৈতিক দলীয় কাঠামো থেকেই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নাগরিক আন্দোলন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে। ফলে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব দলীয় সীমারেখা ছাড়িয়ে সমাজের বিস্তৃত অংশে পৌঁছেছে।

তিনি আরও বলেন, সব মিলিয়ে বলা যায়, ২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ শুধু সংখ্যাগতভাবে বাড়েনি; নীতিনির্ধারণ, জনমত গঠন এবং রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রেও এখন তারাই অন্যতম প্রধান শক্তি। আগামী দিনের বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বের রূপ কেমন হবে, তার বড় একটি অংশ নির্ধারিত হবে এই তরুণ প্রজন্ম কতটা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি ধারণ করতে পারে, তার ওপর।


  বিষয়:   গণঅভ্যুত্থান  হাসিনা সরকারের পতন  জাতীয় রাজনীতি  তরুণ নেতৃত্ব  রাজনীতি 


Loading...
Loading...

রাজনীতি- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: