আল্লাহর কসম, জীবন দেব তবুও ‘২৪’ হারিয়ে যেতে দেব না বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কারের পক্ষে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণ গণভোটে রায় দিয়েছে। কিন্তু সরকার সংবিধান সংষ্কার পরিষদ গঠন না করে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছে।
সংবিধান সংশোধন কমিটি সংবিধানের কোনো বিধিতে আছে কি না সরকারের কাছে প্রশ্ন রেখে জামায়াত আমির বলেন, গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সংবিধান সংশোধনের নামে কোনো ভাঁওতাবাজি জনগণ মেনে নেবে না।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর কাকরাইলে আইডিবির মিলনায়তনে জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে শহীদ আবু সাঈদসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় আলোচনা সভার সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল। সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রাখেন ব্রি. জে. (অব.) হাসিনুর রহমান।
আরও বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এমপি, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জগসু) ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদ সদস্য ড. মোবারক হোসাইন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সভাপতি আব্দুস সালাম প্রমুখ।
এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর আব্দুস সবুর ফকির, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসেন, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য যথাক্রমে এডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন, আবদুর রহমান, কামরুল আহসান হাসান, সৈয়দ সিরাজুল হক, শাহীন আহমেদ খান, মাওলানা শরিফুল ইসলাম, মহানগরীর সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমন, সহকারী মিডিয়া সম্পাদক আশরাফুল আলম ইমনস প্রমূখ।
আজ যে সংসদ ও সরকার গঠিত হয়েছে, সবাই স্বীকার করেন এটি ২০২৪-এর ফসল উল্লেখ করে এসময় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অথচ কেউ কেউ বলতে চান, ২০২৪ তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, আগের অংশটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তো কখনো বলিনি আগের অংশ গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেই সময়েই তো আমরা আমাদের ১১ জন শীর্ষ নেতাকে হারিয়েছি। শত শত সহকর্মীকে হারিয়েছি। অসংখ্য মানুষ কারাগারে গেছেন, চাকরি হারিয়েছেন, বাড়িঘরে থাকতে পারেননি। আমরা সেই ত্যাগ অস্বীকার করি না। কিন্তু এটাও সত্য, ২০২৪ না হলে আজ আমি এখানে বক্তৃতা দিতে পারতাম না, বিরোধীদলীয় নেতা হতে পারতাম না, সংসদ সদস্য হতে পারতাম না। একইভাবে তারেক রহমানও প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না।
সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, কিছু মন্ত্রী দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলেন। সংসদের ভেতরেও বলেন, টকশোতেও বলেন। আমরা যখন এসব বিষয় সংসদে উত্থাপন করি, তখন বলা হয় এগুলো সংসদের বাইরের বিষয়। অথচ আমাদের আঘাত করতে গেলে আধা শতাব্দী আগের ঘটনাও টেনে আনা হয়। সংসদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আপনারা সংসদ দেখেন, কারণ আপনারা এটিকে মজলুম মানুষের সংসদ মনে করেন। সেখানে মজলুম মানুষের প্রতিনিধি জনগণের জন্য কী বলেন, তা জানার আগ্রহ আপনাদের আছে। জনগণই শেষ পর্যন্ত বিবেক দিয়ে সবকিছুর মূল্যায়ন করবেন।
যারা দেশ পরিচালনা করবে তাদের ন্যূনতম নৈতিক মানদন্ড থাকতে হবে উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, যখন সরকারের এক মন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলে, আমরা সংস্কারের পক্ষে হ্যাঁ বলেছি যদি নির্বাচন হতে দেওয়া না হয়! আরেক মন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে টোল মওকুফের কথা বলেছেন কিন্তু টোল মওকুফ করা হবে না! এই যে, মন্ত্রীদের দ্বিচারিতা, জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা এটি রাজনীতির জন্য শুভকর নয়। এর ফলে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা নষ্ট হবে। তিনি বলেন, জুলাইয়ে সবচেয়ে বড় দাবি ছিল ফ্যাসিবাদ যাতে আর ফিরে না আসে। তাই ফ্যাসিবাদের ফিরে আসার পথ বন্ধ করতে হলে অবশ্যই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। শহীদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন না করলে রাষ্ট্র হবে অকৃতজ্ঞ, নিমকহারাম।
ব্রি. জে. (অব.) হাসিনুর রহমান বলেন, যাদের রক্তের ওপর দিয়ে সরকার ক্ষমতা বসেছে তাদের সম্মান করতে পারেনি সরকার। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী শিলং থেকে একজন দেশে এসে দাবি করছেন তিনি না-কি জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন! অথচ জুলাই বিপ্লব এদেশের ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত।
তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, সরকার ঋণ খেলাপিদের ঋণগ্রস্ত বানিয়ে যাকাতের টাকা লুটপাট করার পথ তৈরি করেছে। কারণ ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য যাকাতের টাকা নেওয়ার সুযোগ আছে! লুটপাটের চেষ্টা না করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। নি আরও বলেন, আমরা আর ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থা চাই না, আমরা ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ চাই।
মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, শহীদ আবু সাঈদসহ সকল শহীদকে রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত করতে হবে। শহীদদের স্মরণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সড়কের নামকরণ করতে হবে। জুলাই স্মৃতি জাদুঘর খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে এই সংক্রান্ত কমিটি পুনর্গঠন করতে হবে।
শহীদের রক্তের শক্তি মুছে ফেলবার শক্তি কারো নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, শহীদদের রক্ত নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে চাইলে পরিণতি ভয়াবহ হবে। গণহত্যার বিচার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারি দল হিসেবে বিএনপিকে পথ খুঁজে বের করতে তিনি আহ্বান জানান।
জুলাই আন্দোলনকালীন ইসলামী ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি, পল্টন থানা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মঞ্জরুল ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনে আবু সাঈদকে গুলি করে শহীদ করার মধ্য দিয়ে আন্দোলনে আগুনে ঘী ঢেলে দিয়েছিল হাসিনার পুলিশ বাহিনী। এখান থেকেই ছাত্র সমাজ শপথ করে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই হবে। সেই আন্দোলন একক কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের নয়।
ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ছাত্র-জনতা যেই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে জুলাই বিপ্লব অর্জন করেছে সেই স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ হতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কার ব্যতিত পুরোনো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থায় সরকারকে চলতে দেবে না জুলাই বিপ্লবীরা।
শহীদ মোবারক হোসেনের বাবা রমজান আলী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই গণহত্যার বিচার সম্পন্ন না করেই নির্বাচন দিয়ে নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নিয়েছে। আমরা নতুন সরকারের কাছে জুলাই গণহত্যার বিচার দাবি করছি।