বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল ম্যাচে শিরোপার লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। নিউজার্সিতে আগামীকাল রোববার রাত ১টায় এই মহারণ ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে চলছে তুমুল উত্তেজনা ও বিশ্লেষণ।
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা তাদের আধিপত্য ধরে রাখতে প্রস্তুত, অন্যদিকে স্পেনও শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে পূর্ণ শক্তির দল মাঠে নামাবে।
ফাইনালে কার হাতে উঠবে বিশ্বকাপ, তা নিয়েই এখন বিশ্বজুড়ে মূল আলোচনা। খুব কম দলই আছে, যারা কিনা টানা দুটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছে। ইতিহাস বলে, জার্মানি আর ব্রাজিল অবশ্য টানা তিনটি ফাইনাল খেলেছে।
১৯৮২, ১৯৮৬ আর ১৯৯০ সালে জার্মানি টানা তিন ফাইনালের একটিতে জিততে পেরেছিল। ব্রাজিল তাদের স্বর্ণসময়ে ১৯৯৪, ১৯৯৮ আর ২০০২ তিন-তিনবার ফাইনাল খেলে দুটিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
ইতালি ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে টানা দুবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ২০১৮ আর ২০২২ ফাইনাল খেলে এমবাপের ফ্রান্স একবার ট্রফি স্পর্শ করতে পেরেছিল। এবার মেসির সামনে সুযোগ এসেছে বিশ্বকাপের দ্বিমুকুট মাথায় তোলার। কোপা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা বনাম ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
ইতালিয়ান ভাষায় বিশ্বফুটবলে দুই মহাদেশের দুই চ্যাম্পিয়নের এই লড়াইকে ‘ফিনালেসিমা’ বলেই চিনে থাকে সবাই। ফিফার খুব ইচ্ছা ছিল, এবারের বিশ্বকাপের আগে আগে অন্তত দুই চ্যাম্পিয়নদের মুখোমুখি করতে। ভেন্যুও ঠিক হয়ে গিয়েছিল কাতারের সেই লুসাইলে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ-পরিস্থিতির কারণে সেটি ভেস্তে যায়। নিয়তির কী খেলা, সেই ফিনালেসিমাই কিনা এবার হচ্ছে বিশ্বকাপের ফাইনালে।
মেসির ভাষায়, সেরা দুটি দলই ফাইনালে উঠেছে। এক প্রান্তে ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে নামছেন মহাজাগতিক ওস্তাদ; অন্য প্রান্তে তারই অপার্থিব জাদুকরি ছোঁয়ায় ধন্য বার্সেলোনার নতুন রাজপুত্র, লামিনে ইয়ামাল।
আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বেশ আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে দলটির আত্মবিশ্বাস ও শক্তির জায়গা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কোচ লিওনেল স্কেলোনির অধীনে দলটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত পরিপক্ক হয়ে উঠেছে। প্রতিটি ম্যাচে পিছিয়ে পড়ার পরও ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা তাদের নতুন পরিচয় তৈরি করেছে। দলটির প্রতিটি সদস্যের মধ্যকার বোঝাপড়া ও লড়াকু মানসিকতা তাদের অপরাজেয় করে তুলেছে।
দলের প্রাণভোমরা লিওনেল মেসির নেতৃত্ব ও ব্যক্তিগত নৈপুণ্য আর্জেন্টিনার শক্তির প্রধান উৎস। মেসি শুধু মাঠের অধিনায়ক নন, বরং দলের খেলার চালিকাশক্তি। তাকে কেন্দ্র করেই আর্জেন্টিনার অধিকাংশ আক্রমণ গড়ে ওঠে। তবে কেবল মেসি নন, দলের তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সম্মিলিত প্রচেষ্টা আর্জেন্টিনাকে এক শক্তিশালী দলে পরিণত করেছে। লাউতারো মার্টিনেজসহ অন্যান্য ফরোয়ার্ডদের গোল করার দক্ষতা আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগকে আরও ধারালো করেছে।
এদিকে স্পেনের শক্তিশালী রক্ষণভাগ ও মিডফিল্ড আর্জেন্টিনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ফাইনালের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলা এবং প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, আর্জেন্টিনা এখন এমন একটি দল যারা কৌশলগত যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে দক্ষ। সবশেষ চার ম্যাচেও আর্জেন্টিনা দেখিয়েছে তাদের কামব্যাক করার অসাধারণ ক্ষমতা। গোল হজম করার পর মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে বরং আরও আক্রমণাত্মকভাবে ফিরে আসা তাদের এখনকার খেলার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
ফাইনালের মতো হাইভোল্টেজ ম্যাচে এই মানসিক দৃঢ়তা আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে রাখতে পারে। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার করে ফাইনালে উঠলেও স্পেনের আসল পরীক্ষা হবে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। লা রোজারা যদি তা ধরে রাখতে পারে, তবে তারা একাধিক উপায়ে ইতিহাস গড়বে। দেশের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি তারা একটি আন্তর্জাতিক রেকর্ডও নিজেদের করে নেবে।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা টানা ৩৭টি ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে, যা ২০১৮-২০২১ সালের মধ্যে ইতালির গড়া রেকর্ডের সমান। ফাইনালে একটি জয় স্পেনকে এককভাবে এই রেকর্ডের চূড়ায় নিয়ে যাবে। ২০২৪ সালের ২২ মার্চ কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচে স্পেনের সর্বশেষ পরাজয় এসেছিল।
আর প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে তাদের শেষ পরাজয় ছিল ২০২৩ সালের ২৮ মার্চ, ইউরো ২০২৪-এর বাছাই পর্বে স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে। সেটি ছিল প্রধান কোচ হিসেবে দে লা ফুয়েন্তের দ্বিতীয় ম্যাচ। এরপর স্পেন ইউরো ২০২৪ জিতেছে এবং এখন বিশ্বকাপের ফাইনালে লড়ছে।
দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেনের এই পথচলা এককথায় অসাধারণ। ২০২২ সালের হতাশাজনক বিশ্বকাপের পর তিনি দায়িত্ব নেন এবং লা রোজাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করেন, যা তাদের ইউরো ২০০৮, ২০১০ বিশ্বকাপ এবং ইউরো ২০১২ জয়ী সোনালি প্রজন্মের সাফল্যের প্রতিচ্ছবি। এবারের বিশ্বকাপে স্পেন মাত্র একটি গোল খেয়েছে এবং কোনও ম্যাচেই তারা পিছিয়ে পড়েনি।
সেমিফাইনালের আগে ফ্রান্সও কোনও ম্যাচে পিছিয়ে পড়েনি, কিন্তু স্পেনের বিরুদ্ধে তারা ম্যাচের ৮২ মিনিটের আগে লক্ষ্যে একটি শটও নিতে পারেনি। ফরাসিদের বিরুদ্ধে ব্যালন ডিঅর জয়ী রদ্রি যখন মাঝমাঠে তার সেরা ছন্দে খেলছিলেন, তখন স্পেনকে একটি নিখুঁতভাবে পরিচালিত যন্ত্রের মতো দেখাচ্ছিল।
আর্জেন্টিনার জন্য আরও আশঙ্কার কথা হলো, লামিনে ইয়ামালের কাছ থেকে সেরাটা না পেয়েও স্পেন ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। আর্জেন্টিনারও ২০১৯-২০২২ সালের মধ্যে টানা ৩৬টি ম্যাচ অপরাজিত থাকার নিজস্ব রেকর্ড ছিল। ২০২২ সালের সেই বিশ্বকাপ জয়ী দলের লিওনেল মেসিসহ অনেক খেলোয়াড়ই এবারও দলে আছেন। মেসি পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে নিজের জাদুকরি পারফরম্যান্স ধরে রেখেছেন।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২-১ গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও জিতে ফিরে আসা ম্যাচে তিনি নিজে গোল না করলেও দুটি গোলেই অ্যাসিস্ট করেছিলেন, যা তাকে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে রেখেছে। মেসি ও ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে উভয়েরই গোলসংখ্যা আটটি। তবে এমবাপের তিনটি অ্যাসিস্টের বিপরীতে মেসির অ্যাসিস্ট চারটি। ফলে ফাইনালের আগে মেসি এগিয়ে আছেন এবং প্রথমবারের মতো গোল্ডেন বুট জেতার দৌড়ে ফেভারিট।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আরেকটি নাটকীয় ম্যাচে ৮৫ এবং ৯২ মিনিটে গোল করে জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল আলবিসেলেস্তেরা। ফাইনালে ওঠার পথে নকআউট পর্বের চারটি ম্যাচের মধ্যে দুটি ম্যাচে তাদের অতিরিক্ত সময়ে খেলতে হয়েছে এবং বাকি দুটি ম্যাচে তারা অ্যাড্রেনালিন জাগানো প্রত্যাবর্তন বা কামব্যাক করেছে।
ফাইনালটি ঘিরে অপেক্ষা করছে একাধিক ঐতিহাসিক রেকর্ড। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলবে ইউরো চ্যাম্পিয়ন ও কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন দুই দল। একই সঙ্গে ১৯৯২ সালে ফিফা র্যাঙ্কিং চালুর পর প্রথমবার র্যাঙ্কিংয়ের এক ও দুই নম্বর দল মুখোমুখি হবে বিশ্বকাপ ফাইনালে। আর্জেন্টিনার সামনে রয়েছে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ। এর আগে শুধু ইতালি ও ব্রাজিল এই কীর্তি গড়তে পেরেছিল। ব্যক্তিগতভাবেও রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে লিওনেল মেসি। ফাইনালে খেললে ব্রাজিলের কাফুর পর দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে অংশ নেবেন তিনি। পাশাপাশি বিশ্বকাপে ১০০টি সুযোগ তৈরির মাইলফলক স্পর্শ করতে প্রয়োজন মাত্র একটি সুযোগ সৃষ্টি।
অন্যদিকে বিশ্বকাপে বদলি নেমে এক আসরে একাধিক গোল করা প্রথম আর্জেন্টাইন ফুটবলার হয়েছেন লাউতারো মার্তিনেজ। এবারের নকআউট পর্বে বদলি খেলোয়াড়দের করা চারটি ম্যাচজয়ী গোলও নতুন রেকর্ড হয়ে গেছে।