মারাকানার কান্না থেকে অমরত্বের দ্বারপ্রান্তে ​

আরাফাত রহমান

খেলা

​বিশ্বকাপের ইতিহাসে কিছু পরাজয় কেবল একটি ম্যাচের ফল নয়; সেগুলো হয়ে ওঠে একটি জাতির সম্মিলিত বেদনার প্রতীক। আবার কিছু জয়

2026-07-18T14:46:31+00:00
2026-07-18T14:49:27+00:00
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
খেলা
মারাকানার কান্না থেকে অমরত্বের দ্বারপ্রান্তে ​
আরাফাত রহমান
শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬, ২:৪৬ পিএম  আপডেট: ১৮.০৭.২০২৬ ২:৪৯ পিএম
লিওনেল মেসি
​বিশ্বকাপের ইতিহাসে কিছু পরাজয় কেবল একটি ম্যাচের ফল নয়; সেগুলো হয়ে ওঠে একটি জাতির সম্মিলিত বেদনার প্রতীক। আবার কিছু জয় শুধু ট্রফি এনে দেয় না, বদলে দেয় একটি প্রজন্মের ফুটবল-স্মৃতি। আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে ২০১৪ ও ২০২২—দুটি বছর যেন সেই দুই বিপরীত মেরুর নাম।

​২০১৪ সালের ১৩ জুলাই, ব্রাজিলের ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়াম। বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো গোল নেই, ম্যাচ গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। এরপর ম্যাচের ১১৩ মিনিটে মারিও গোটজের সেই ভলি! কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে বদলে গেল একটি ম্যাচের ভাগ্য, স্তব্ধ হয়ে গেল কোটি আকাশি-সাদা স্বপ্ন।

​আর্জেন্টিনার সামনে তখন উঁকি দিচ্ছিল বিশ্বকাপ, কিন্তু শেষ বাঁশির শব্দে তা ছুঁয়ে দেখার অধিকার হারায় তারা। মেসির চোখে হতাশা, সমর্থকদের মনে বিষাদের শূন্যতা—মারাকানার সেই রাত হয়ে রইল অপূর্ণতার এক গভীর ক্ষত।

​তবে ফুটবল কখনো কখনো অসমাপ্ত রূপকথারও মধুর সমাপ্তি লিখে দেয়।

​লুসাইল: ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান

​আট বছর পর, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা আবারও বিশ্বমঞ্চে। শুরুটা অবশ্য হয়েছিল চরম ধাক্কায়, সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচেই হার। কিন্তু সেই পরাজয়ই যেন খাদের কিনারা থেকে জাগিয়ে তুলেছিল লিওনেল স্কালোনির দলকে।

​এরপরের গল্পটা শুধুই ঘুরে দাঁড়ানোর। দলটির মধ্যে তৈরি হলো আত্মবিশ্বাস, সংহতি এবং সাহসের এক অনন্য সমন্বয়। আর সেই যাত্রার শেষ অধ্যায় লেখা হলো লুসাইল স্টেডিয়ামে—ফ্রান্সের বিপক্ষে এক অবিশ্বাস্য ও শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে।

​দুই দল মিলে উপহার দিয়েছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক রাত। লিওনেল মেসির জোড়া গোল, আনহেল দি মারিয়ার নান্দনিকতা আর কিলিয়ান এমবাপ্পের দুরন্ত হ্যাটট্রিক—১২০ মিনিটের চরম নাটকীয়তার পর ম্যাচ গড়াল টাইব্রেকারে।

​শেষ পর্যন্ত জয় হলো আর্জেন্টিনারই। অবসান ঘটল ৩৬ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার। আকাশি-সাদা জার্সির ওপর যুক্ত হলো তৃতীয় তারকা। আর লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারে পূর্ণতা পেল সেই একমাত্র অপূর্ণতা, যা নিয়ে বছরের পর বছর ফুটবল বিশ্বে আলোচনা চলেছে। 

মারাকানার অশ্রু লুসাইলে এসে পরিণত হলো আনন্দের বন্যায়। যে বিশ্বকাপ ’১৪-তে খুব কাছে গিয়েও ছোঁয়া যায়নি, ’২২-এ সেই ট্রফিতেই পরম মমতায় চুমু আঁকলেন মেসি-দি মারিয়ারা।

​উত্তরাধিকারের শেষ অধ্যায়: আর্জেন্টিনা বনাম স্পেন

​২০২৬ বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনার জন্য নিছক আরেকটি শিরোপা ধরে রাখার লড়াই নয়; এটি একটি যুগের উত্তরাধিকার নির্ধারণের চূড়ান্ত মঞ্চ। আর সেই মঞ্চের শেষ দৃশ্যপটে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি নতুন প্রজন্মের দুর্দান্ত ফুটবলের প্রতীক—স্পেন। দুই ভিন্ন ফুটবল-দর্শন, দুই ভিন্ন গল্প—কিন্তু লক্ষ্য এক, বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি।

​মেসির আলো ও আর্জেন্টিনার নতুন সূর্য : ​২০২২-এর শিরোপা জয়ের পর স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা গড়ে তুলেছে এক অপরাজেয় শক্তি। ২০২৬-এ এসে সেই দল যেন আরও পরিণত। আর এই যাত্রার কেন্দ্রে যথারীতি লিওনেল মেসি। পুরো টুর্নামেন্টে ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট নিয়ে ৩৯ বছর বয়সী এই জাদুকর আবারও প্রমাণ করেছেন, সময় ও বয়স তাঁকে থামাতে পারে না।

​তবে এবারের গল্পটা শুধু মেসির একার নয়, এটি তাঁর রেখে যাওয়া ফুটবল সংস্কৃতির। মেসি পথ দেখাচ্ছেন, আর সেই মশাল হাতে তুলে নিয়েছেন এনজো ফার্নান্দেজ, লাউতারো মার্টিনেজ ও হুলিয়ান আলভারেজরা। আর্জেন্টিনার এই নতুন প্রজন্ম দেখিয়েছে—মেসি তাদের প্রেরণা, কিন্তু দল এখন আর একক কোনো তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়।

​স্পেনের নতুন বিপ্লব: তারুণ্যের ঔদ্ধত্য

কিন্তু আর্জেন্টিনার এই অপরাজেয় যাত্রাকে থামিয়ে দিতে প্রস্তুত এক নতুন স্পেন। অতীতের 'টিকিটাকা' দর্শনের সাথে আধুনিক গতি ও নিখুঁত প্রেসিংয়ের মিশেলে স্প্যানিশরা এবার অপ্রতিরোধ্য। লামিন ইয়ামাল, রদ্রি কিংবা দানি ওলমোর মতো প্রতিভাবানদের হাত ধরে স্পেন ফুটবল বিশ্বে এক নতুন সাম্রাজ্য গড়তে চাইছে। 

একদিকে আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ আভিজাত্য, অন্যদিকে স্পেনের ক্ষীপ্র তারুণ্য—ফাইনালটি তাই হয়ে উঠেছে দুই ফুটবল প্রজন্মের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই।

​শেষ বাঁশির অপেক্ষা : ​২০১৪ সালে আর্জেন্টিনার গল্প থেমেছিল মারাকানার তিক্ততায়, ২০২২-এ পূর্ণতা পেয়েছিল লুসাইলের অশ্রুসিক্ত আনন্দে। আর ২০২৬-এ ইতিহাস দাঁড়িয়ে আছে এক চূড়ান্ত মোহনায়।

​মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা কি পারবে ব্যাক-টু-ব্যাক বিশ্বকাপ জিতে নিজেদের আধিপত্যকে অমরত্ব দিতে? নাকি স্পেনের নতুন প্রজন্ম এসে থামিয়ে দেবে আর্জেন্টিনার স্বপ্নযাত্রা, লিখবে নিজেদের সোনালি ইতিহাস? 

৯০ বা ১২০ মিনিটের টানটান উত্তেজনা, কিংবা ভাগ্যনির্ধারক টাইব্রেকার—উত্তর লুকিয়ে আছে মাঠেই। ইতিহাস লেখার কলম হাতে দুই দলই এখন প্রস্তুত, অপেক্ষা শুধু শেষ বাঁশির!


  বিষয়:   ​বিশ্বকাপ  আর্জেন্টিনা  মারাকানা স্টেডিয়াম  জার্মানি  ​লুসাইল  লিওনেল মেসি 


Loading...
Loading...

খেলা- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: