পূর্বাচলের বহু এলাকায় ভয়ে পা বাড়াচ্ছে না গ্রাহকরা

সাইদুল ইসলাম

রাজধানী

ঢাকার চাপ সামলাতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প গ্রহণ করা হয় ৩১ বছর আগে। কিন্তু এখন পর্যন্ত

2026-07-18T12:58:14+00:00
2026-07-18T12:58:14+00:00
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
রাজধানী
পূর্বাচলের বহু এলাকায় ভয়ে পা বাড়াচ্ছে না গ্রাহকরা
সাইদুল ইসলাম
শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
ঢাকার চাপ সামলাতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প গ্রহণ করা হয় ৩১ বছর আগে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ প্রকল্পের কাজ করতে পারেনি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউক। 

সম্প্রতি ১৮৮টি বাড়ি নির্মাণ হলেও পূর্ণাঙ্গ শহর হিসেবে গড়ে না উঠায় বসবাস করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না অনেকে। এখানে এমন এলাকা রয়েছে যেখানে গ্রহক ও সাধারণ মানুষ যেতেও ভয় পাচ্ছে। এখানে পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা না থাকলেও নানা খাতে ব্যয় করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এ বাড়তি ব্যয়ের পুরোটাই চাপিয়ে দেয়ার শঙ্কায় রয়েছে প্লট গ্রহীতারা। কবে নাগাদ এ প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হবে তাও বলতে পারছে না রাজউক। ফলে গ্রাহকদের উৎকণ্ঠার মধ্যেই থাকতে হচ্ছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে প্রায় ৬ হাজার ২২৭ একর জায়গায় পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের কাজ শুরু করে রাজউক। তখন বলা হয়েছিল, পূর্বাচলে ২৫ লাখের মতো মানুষ বসবাস করতে পারবে। এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির নকশা পাঁচবার সংশোধিত হয়েছে। মেয়াদও বেড়েছে কয়েক দফা। এরসাথে প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়েছে অনেক। 

এরইমধ্যে বেশকিছু প্লট গ্রাহকদের বুঝিয়ে দেওয়া হলেও সেসব প্লটে ঘরবাড়ি নির্মাণের মতো সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করায় গ্রাহকরা নিজ দায়িত্বে আবাসন নির্মাণ করছে না। আবাসন না থাকলেও প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণ পানি সরবরাহ নামসহ নানা খাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। অসম চুক্তির মাধ্যমে এমন একটি প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা রাজউক পরিশোধ করবে। এর বাইরে ১১ বছর ধরে প্রতি বছর ৫৭ কোটি টাকা করে কার্যক্রম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বহন করবে প্রতিষ্ঠানটি। এতে এ প্রকল্পে শুধু রক্ষণাবেক্ষণেই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পাবে ৬২৭ কোটি টাকা। ফলে প্রকল্পে ব্যয় দাঁড়াবে ১ হাজার ২১৯ কোটি টাকায়।

রাজউক দাবি করছে, প্রকল্পের ৯৫ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ দ্রুত শেষ করতে কাজ চলছে। এ প্রকল্পের প্রথম আকার ছিল ৩ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। দফায় দফায় প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর কারণে আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা। বাড়তি ব্যয়ের পুরোটাই বহন করতে হচ্ছে প্লট গ্রহীতাদের। কিন্তু গ্রাহকদের এখানে বসবাস করার মতো কোন সুযোগ-সুবিধা এখনও নিশ্চিত হয়নি। তবে কয়েকটি সেক্টরে পানির সংযোগ দেয়া হয়েছে। 

এছাড়া, আর তেমন কোন সুবিধা দেখা যায়নি। এ পানি সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে এখন কোটি কোটি ব্যয় করা হচ্ছে। জানা গেছে, এ প্রকল্পে পানি সরবরাহের জন্য রাজউকের সাথে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর ইউনাইটেড ডেলকট কোম্পানির একটি চুক্তি হয়। 

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় এ প্রকল্পে চুক্তি অনুযায়ী প্রথম চার বছরে রাজউক বিনিয়োগ করছে ২৯৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বাকিটা দেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। গ্রাহকসংখ্যা যা-ই থাকুক পানির সংযোগ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি বছর ঠিকাদারকে দিতে হবে ৫৭ কোটি টাকা। ১১ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে শুধু রক্ষণাবেক্ষণের খাতেই প্রতিষ্ঠানটি পাবে সব মিলিয়ে ৬২৭ কোটি টাকা। অথচ এ সময়ে সেখানে পানি বিক্রি করে বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ উঠে আসা সম্ভব না। ফলে এ খাতে কোটি কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

প্রকল্পের পরিচালক ও রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদিউল আলম বলেন, প্রকল্পে এখন পর্যন্ত রাজউক মাত্র ৬০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে এবং ৫৪০টি বাড়িতে পানির সংযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে এখানে ১৮৮টি বাড়ি রয়েছে। আরো কিছু বাড়ির কাজ চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, যেসব বাড়িতে সংযোগ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। ফলে প্রকল্পে ব্যয় হতেই পারে। 

এদিকে, প্রকল্পের অসম চুক্তি এবং অনিয়ম তদন্তে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব ড. আরিফুল হককে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যেখানে সদস্য সচিব করা হয়েছে পূর্বাচল পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ বদিউল আলমকে। কিন্তু তিনি তদন্ত প্রতিবেদনে নিজেদের পক্ষে সাফাই গেয়ে প্রকল্পকে ইতিবাচক হিসেবে রিপোর্ট দিয়েছেন। ফলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ নেই। তবে গ্রাহকরা বলছেন এ প্রকল্পটির কাজ এখনো পুরোপুরিভাবে শেষ হয়নি। এভাবে অযথা অর্থ অপচয় করা বন্ধ করতে করতে হবে। না হয় এক সময় আমাদের ঘারে এ অর্থ চাপিয়ে দিতে পারে। কারণ অতিতে এমন ঘটনা ঘটেছে। তাই এ বিষয়ে সরকারকে কঠোর হওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। 

সরেজমিন দেখা যায়, এখনও ধীরগতিতে চলছে প্রকল্পের উন্নয়নকাজ। মোট ৩২০ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে এখনো অনেক রাস্তার কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। ১৫০ ফুট প্রশস্ত বড় রাস্তাগুলোর কাজ এগিয়ে গেলেও থেমে আছে ছোট আকারের ৩০ ও ৭৫ ফুট রাস্তা নির্মাণের কাজ। ৩০টি সেক্টরের মধ্যে বেশ কয়েকটি সেক্টরে এখনো উন্নয়নকাজ শেষ করতে পারেনি রাজউক। 

এর কারণ হিসেবে অবৈধ দখল আর মামলাসংক্রান্ত জটিলতাকেই দায়ী করা হচ্ছে। প্রকল্পের পানি নিষ্কাশন ও সৌন্দর্য বাড়াতে রয়েছে মোট ৪৮টি ছোট-বড় লেক। লেকগুলোর কাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। এছাড়া, এ প্রকল্পে মোট ব্রিজ রয়েছে ৬২টি। 

এরমধ্যে কয়েকটির কাজ এখনো বাকি রয়েছে। এছাড়া ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ লাইন নির্মাণকাজও পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। 

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এখানে পর্যাপ্ত আবাসন গড়ে না উঠলেও বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেকে ঘুরতে আসায় আমরা দোকান পাট বসিয়েছি। কিন্তু সন্ধ্যার পর পূর্বাচলের বিভিন্ন এলাকা কার্যত অপরাধীদের দখলে চলে যায়। নিরাপত্তাহীনতার কারণে ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত সময়ের আগেই দোকান বন্ধ করতে বাধ্য হন। 

অনেকের দাবি, রাতে দোকান বন্ধ করার পর চুরি ও মালামাল লুটের ঘটনা ঘটছে। একই সাথে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির নিরাপত্তা নিয়েও আতঙ্কে রয়েছেন বাসিন্দারা। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এ প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ হবে বলে জানিয়েছেন। 

তিনি বলেন, প্রকল্পটির সব কাজ দ্রুত শেষ করতে রাজউককে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। শেষ হলে এটি একটি পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। 

তিনি বলেন, পরিকল্পিত নতুন শহর পূর্বাচলে ক্রমবর্ধমান অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে পূর্বাচলকে ডিএমপির আওতায় এনে একটি পূর্ণাঙ্গ থানা চালুর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুলিশ ক্যাম্প চালু হলে এলাকাবাসী দ্রুত ও সহজে পুলিশি সেবা পাবেন। একই সাথে ছিনতাই, চুরি, জমি দখল, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ দমনে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। 


  বিষয়:   ঢাকা  রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ  পূর্বাচল  রাজউক 


Loading...
Loading...

রাজধানী- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: