২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল শুধু দুই পরাশক্তির শিরোপা লড়াই নয়, এটি হতে যাচ্ছে কৌশল, অভিজ্ঞতা ও দর্শনেরও এক রোমাঞ্চকর দ্বৈরথ। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি ফুটবলপ্রেমীদের নজর থাকবে দুই কোচের দিকেও—যেখানে মুখোমুখি হচ্ছেন একসময়কার গুরু ও তাঁরই শিষ্য। তাই বিশ্বকাপের শেষ লড়াইয়ে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে এই অনন্য সম্পর্ক।
ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে সাধারণত থাকে শিরোপার লড়াই, ইতিহাস গড়ার লড়াই। তবে এবার আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মহারণে যোগ হয়েছে এক ভিন্ন আবেগও। স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি একসময় ছিলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী। এবার সেই দুজনই দাঁড়িয়ে আছেন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে, প্রতিপক্ষের ডাগআউটে।
বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। একদিন পর ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ফলে সোমবার ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দুই বর্তমান চ্যাম্পিয়ন।
স্পেন দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিততে চায়। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম ও একমাত্র শিরোপা জিতেছিল তারা। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার লক্ষ্য টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়। ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর এই কীর্তি আর কোনো দল করতে পারেনি।
তবে এই ফাইনালের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি মাঠের বাইরের। ২০১৭ সালে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের (আরএফইএফ) লাস রোসাস কোচিং একাডেমিতে কোচিং কোর্স করেছিলেন সদ্য অবসর নেয়া লিওনেল স্কালোনি। সেখানে প্রশিক্ষক বা টিউটরদের একজন ছিলেন লুইস দে লা ফুয়েন্তে, যিনি তখন স্পেনের বয়সভিত্তিক দলের দায়িত্বে ছিলেন।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করে কোচিং ক্যারিয়ারের প্রথম ধাপেই দে লা ফুয়েন্তের কাছ থেকে দিকনির্দেশনা পেয়েছিলেন স্কালোনি। সেই সময়ের সম্পর্কই আজ বিশ্বকাপ ফাইনালে এনে দাঁড় করিয়েছে দুজনকে।
২০২৪ কোপা আমেরিকার সময় দে লা ফুয়েন্তের কথা স্মরণ করে স্কালোনি বলেছিলেন, ‘লুইস আমাদের মতো যারা লাস রোসাসে কোচিং কোর্স করেছিল, তাদের জন্য বিশাল সহায়ক ছিলেন। তার সঙ্গে অনেকবার কথা হয়েছে। আমি তার সর্বোচ্চ সাফল্য কামনা করি।’
আরেকবার তিনি বলেন, ‘আমি চাই স্পেন ভালো করুক। কোচিং কোর্সের সময় তিনি আমাদের অনেক সাহায্য করেছেন। তিনি যেভাবে দল পরিচালনা করেন এবং যেভাবে খেলোয়াড়রা তার জন্য নিজেদের উজাড় করে দেয়, সেটা আমার খুবই ভালো লাগে।’
শুধু স্কালোনিই নন, দে লা ফুয়েন্তেও বরাবরই প্রশংসা করেছেন তার সাবেক ছাত্রের। এমনকি স্কালোনিকে তিনি ‘মাস্টার’ বলেও উল্লেখ করেছেন, যা একজন সাবেক শিক্ষার্থীর জন্য বিরল সম্মান। কারণ স্কালোনির হাত ধরেই আর্জেন্টিনা জিতেছে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং ফিনালিসিমা।
ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পর দে লা ফুয়েন্তে বলেছিলেন, আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হলে তিনি ‘খুশি’ হবেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো আর্জেন্টিনাকে তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ মনে করছেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে কারণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি চেয়েছিলেন বহু বছরের পরিচিত এবং নিজের সাবেক ছাত্র স্কালোনির বিপক্ষে ফুটবলের সবচেয়ে বড় ম্যাচে লড়তে।
স্কালোনির জীবনের বড় একটি অংশ জুড়েই রয়েছে স্পেন। ২০০৮ সালে পরিচয় হয় তার স্প্যানিশ স্ত্রী এলিসা মনতেরোর সঙ্গে। তাদের দুই সন্তানই স্পেনে জন্মগ্রহণ করেছে। বর্তমানে পরিবার নিয়ে স্পেনের মায়োর্কায় বসবাস করেন ৪৮ বছর বয়সী এই কোচ। খেলোয়াড়ি জীবনেও স্পেনে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন স্কালোনি। খেলেছেন দেপোর্তিভো লা করুনিয়া, রাসিং সান্তান্দের ও মায়োর্কার হয়ে।
২০২৪ ইউরো চলাকালে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার পরিবারের একটি বড় অংশই স্প্যানিশ। স্বাভাবিকভাবেই আমি স্পেনের সমর্থন করছি।’
স্পেন ফাইনালে ওঠার পর, আর আর্জেন্টিনার সেমিফাইনালের আগের দিন স্কালোনি হেসে বলেছিলেন, ‘আমি তার (লুইস দে লা ফুয়েন্তে)জন্য খুবই খুশি। তিনি এটা প্রাপ্য। অসাধারণ একজন মানুষ। তার দলে আমরা যা দেখি, সেটাই আমরা নিজেদের দলেও দেখতে চাই।’
এরপর মজার ছলে যোগ করেন, ‘যদি আমাদের সবকিছু ঠিকঠাক না চলে, তাহলে আমি তাকে ফোন করব। তবে যদি ফাইনালে তার বিপক্ষে খেলতে হয়... না, তাহলে ফাইনালের আগে কোনো ফোন নয়।’
সোমবারের ফাইনাল পর্যন্ত সেই ফোনকলও অপেক্ষায় থাকবে। কারণ মাঠে নামার আগে বন্ধুত্বকে সরিয়ে রাখতে হবে দুজনকেই। এবার দেখা যাবে, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় শিক্ষক নাকি তারই সাবেক ছাত্র, কার কৌশল শেষ পর্যন্ত সফল হয়।