নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি বলেছে, রাজস্ব ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত বৈদেশিক চাপ বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এসব সংকট মোকাবিলায় রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ভর্তুকি যৌক্তিক করা, কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা এবং ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে আইএমএফ। পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির আকার, অর্থায়নের পরিমাণ এবং সংস্কার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আগামী কয়েক মাসে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
সরকারের অনুরোধে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ১২ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত ঢাকা সফর করে। সফরকালে তারা দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য নতুন আইএমএফ-সমর্থিত কর্মসূচির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে।
প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন আইএমএফ কর্মকর্তা আইভো ক্রজনার। সফরের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) তিনি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন।
বৈঠক শেষে এক বিবৃতিতে আইএমএফ জানায়, এই তথ্য-সংগ্রহমূলক সফরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের সাম্প্রতিক অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের নীতিগত পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রাধিকার এবং সক্ষমতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, নতুন সম্ভাব্য আইএমএফ কর্মসূচির পরিধি, ঋণের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে আগামী কয়েক মাস আলোচনা চলবে।
আইএমএফের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনও রাজস্ব, আর্থিক খাত এবং মূল্যস্ফীতিজনিত বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এসব চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে দেশে আবারও মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে ভর্তুকি ব্যয় বাড়ায় সরকারের সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক খাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। যদিও প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক রয়েছে, তবুও উচ্চ আমদানি ব্যয়ের কারণে বহিঃখাতের ভারসাম্য রক্ষায় চাপ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের চাপও এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
আইএমএফ জানায়, এবারের আলোচনা ২০২৫ সালের আর্টিকেল-৪ পরামর্শ প্রতিবেদনে চিহ্নিত নীতিগত অগ্রাধিকারকে ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে। সংস্থাটির মতে, সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি এবং ভর্তুকি ব্যবস্থা যৌক্তিক করা জরুরি। পাশাপাশি রাজস্ব সংস্কারের প্রভাব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনের জন্য কঠোর মুদ্রানীতি ও সতর্ক রাজস্বনীতি অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। পাশাপাশি ২০২৫ সালে চালু হওয়া ‘ক্রলিং পেগ’ বিনিময় হার ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিনিময় হার আরও নমনীয় করার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
ব্যাংকিং খাত নিয়ে আইএমএফ বলেছে, একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত কৌশলের আওতায় ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন জরুরি। একই সঙ্গে সুশৃঙ্খলভাবে খাতটির দুর্বলতা দূর করতে পারলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে এবং বিনিয়োগও উৎসাহিত হবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়েও সতর্কবার্তা দিয়েছে সংস্থাটি। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়িত না হলে ২০২৭ অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। আর রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, আর্থিক সক্ষমতা সৃষ্টি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশেরও নিচে নেমে যেতে পারে।
সংস্থাটির মতে, ব্যাংকিং খাতের চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈদেশিক খাতের ঝুঁকি পরস্পরকে আরও তীব্র করতে পারে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির সামগ্রিক ঝুঁকি নিম্নমুখী হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
সফর শেষে বাংলাদেশের সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আন্তরিক সহযোগিতা এবং গঠনমূলক আলোচনার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে আইএমএফ প্রতিনিধি দল। পাশাপাশি ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহের কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।