লুটপাট, অনিয়ম এবং কাঠামোগত অব্যবস্থাপনায় ধ্বংসের পথে দেশের অধিকাংশ ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই)।
নিয়ম না মেনে নামে-বেনামে ঋণ, জামানতহীন অনুমোদন আর দায়মুক্ত গ্রাহকদের ছাড় সবমিলিয়ে খেলাপি ঋণের বোঝা এখন পাহাড়সম। দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বিগত সময়ের সীমাহীন অনিয়ম ও লুটপাটে এ খাতটি ২০১৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে লোকসানে ধুঁকছে। ইতোমধ্যে দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে সংকটাপন্ন ৫টি প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি আরও ৪টি প্রতিষ্ঠানকে পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উন্নতি না হলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ আসতে পারে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, এনবিএফআই খাতে সংকট এখন পুরো আর্থিক খাতকেই ঝুঁঁকিতে ফেলছে। সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা না নিলে আরও প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে পড়বে, আর সাধারণ আমানতকারীরা হারাবেন তাদের কষ্টার্জিত অর্থ।
এরই মধ্যে জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, দেশের আর্থিকখাতে গত কয়েক বছরে সংঘটিত অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের তদন্ত চলছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
তিনি সংসদে আরও জানান, আর্থিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে পুরো আর্থিক খাতে একটি ‘ক্লিনিং প্রসেস’ বা পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। যার আওতায় প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের অনিয়ম খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে শুরু হওয়া সেই আর্থিক বিপর্যয় সময়ের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে পুরো ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতে। এর প্রভাব এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি খাতটি; বরং কিছু প্রতিষ্ঠানের সংকট পুরো খাতের স্থিতিশীলতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এছাড়াও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা নতুন নয়। এ খাতে বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ পি কে হালদারের বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি। প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদার যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে ছিলেন, সেগুলোর অধিকাংশই এখন খেলাপি ঋণের চাপে ভেঙে পড়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের আর্থিক বাজারে বৈচিত্র্য আনা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সেই ভূমিকা পালন করতে পারেনি।
তিনি বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান নিজস্বভাবে তহবিল সংগ্রহের সক্ষমতা তৈরির পরিবর্তে ব্যাংক থেকেই অর্থ সংগ্রহ করে ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে ব্যাংক থেকে উচ্চ ব্যয়ে তহবিল নিয়ে আরও বেশি সুদে ঋণ বিতরণ করতে হচ্ছে।
তার মতে, এত বেশি সুদে ঋণ দিলে মুনাফা অর্জন তো দূরের কথা, সেই অর্থ পুনরুদ্ধার করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এর বাইরে বিগত সময়ে খাতটিতে নানা অনিয়ম ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে।
টানা সাত বছর ধরে লোকসানেই পরিচালিত দেশের আর্থিক খাত প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত ২০২৫ সালের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৯ সাল থেকে টানা লোকসানে রয়েছে খাতটি। সর্বশেষ ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে এই খাতের লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩ কোটি টাকায়। ২০২৪ সালে লোকসানের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা হয়েছিল ৮৩০ কোটি টাকা। এর পরের বছরই (২০১৯ সাল) বড় ধরনের লোকসানে পড়ে খাতটি। ওই বছর লোকসানের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২২০ কোটি টাকা। ২০২০ সালে লোকসান কমে নেমে আসে ১৭২ কোটি টাকায়।
২০২১ সালে সেই লোকসান সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় ২০০ কোটিতে। এর পর ২০২২ সালে লোকসান এক লাফে বেড়ে ৩ হাজার ১০৪ কোটিতে পৌঁছে।
২০২৩ সালে লোকসান আবার কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮০৩ কোটিতে। তবে ২০২৪ সালে লোকসান ফের বেড়ে রেকর্ড ৩ হাজার ৫৫৫ কোটিতে ওঠে। ২০২৫ সালের পুরো চিত্র এখনও প্রকাশ করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তবে নানা অনিয়মের কারণে সংকটে থাকা পাঁচটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনবিএফআই এরই মধ্যে অবসায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে আরও চারটি প্রতিষ্ঠানকে শর্তসাপেক্ষে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অবসায়ন হতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, আভিভা ফাইন্যান্স কোম্পানি, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট।
এর মধ্যে আভিভা ফাইন্যান্সের চেয়ারম্যান ছিলেন চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম, যিনি এস আলম নামে পরিচিত। অন্য চারটির নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেলেঙ্কারির দায়ে বহুল আলোচিত ব্যক্তি প্রশান্ত কুমার হালদার বা পিকে হালদারের হাতে।
সর্বশেষ কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এ জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিশেষ তহবিল বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে এ খাতের সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্স লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কায়সার হামিদ বলেন, গত ২০১৯ সাল থেকেই আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত ধারাবাহিক লোকসানের মধ্যে রয়েছে। এখন এটিকে আর স্বাভাবিক ব্যবসায়িক দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি জানান, বর্তমানে খাতটিতে গড় খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশের বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তারল্য সংকট, নতুন ঋণ বিতরণের সীমিত সক্ষমতা এবং ভালো ঋণের পরিমাণ কমে যাওয়া। ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যালান্সশিট ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, খেলাপি ঋণ থেকে নগদ অর্থ পুনরুদ্ধারের হারও কমে গেছে। একই সময়ে গড়ে নিট সুদ স্প্রেড ৩ থেকে ৪ শতাংশ এবং আয় ও ব্যয়ের অনুপাত ৬০ শতাংশের বেশি থাকায় আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্যও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে প্রকৃত মুনাফা অর্জনও সীমিত হয়ে যাচ্ছে।