বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৩.৪ অর্জনে প্যাকেটজাত খাদ্যের সামনের অংশে সহজবোধ্য সতর্কবার্তা বা ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) দ্রুত প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা মনে করছেন, ভোক্তাদের সচেতন খাদ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে এবং অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাদ্য গ্রহণ কমাতে এফওপিএল কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি এ বিষয়ে ইতিবাচক জনমত গড়ে তুলতে গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে প্যাকেটজাত খাদ্যের সামনের অংশে লেবেলিং (এফওপিএল) বিষয়ক গণমাধ্যম প্রচারাভিযান’ শীর্ষক মিডিয়া অ্যাডভোকেসি কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
কর্মশালার শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদ বলেন, বর্তমানে বাজারে বিক্রিত অধিকাংশ প্যাকেটজাত খাদ্যের পুষ্টিগত তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য জটিল ও দুর্বোধ্য। ফলে ভোক্তারা না বুঝেই অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও ট্রান্সফ্যাটসমৃদ্ধ খাদ্য কিনে ফেলছেন। তিনি বলেন, পণ্যের সামনের অংশে সহজ ভাষায় ও স্পষ্ট সতর্কবার্তা থাকলে ক্রেতারা মুহূর্তেই পণ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাবেন এবং সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এতে দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা আরও শক্তিশালী হবে।
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস তার উপস্থাপনায় বিশ্বব্যাপী এফওপিএল বাস্তবায়নের অগ্রগতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যে সফলভাবে এ নীতি বাস্তবায়ন করেছে এবং এর ইতিবাচক প্রভাবও পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনস্বার্থে এফওপিএল নীতিমালা প্রণয়নের এটাই উপযুক্ত সময় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার মো. মাহফুজুর রহমান মিলন বলেন, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নির্বাচন করতে সঠিক তথ্য জানা প্রতিটি ভোক্তার মৌলিক অধিকার। কার্যকর ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং সেই অধিকার বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একই সঙ্গে এটি বিদ্যমান ভোক্তা অধিকার আইনকে আরও কার্যকর করতে এবং নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ড. আহমাদ খায়রুল আবরার বলেন, আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং ভোক্তাদের স্বাস্থ্যকর খাদ্য বেছে নিতে উৎসাহিত করে। পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও পণ্যের উপাদান আরও স্বাস্থ্যসম্মত করতে উদ্বুদ্ধ হয়। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে বাংলাভিশনের সিনিয়র নিউজ এডিটর আবু রুশদ মো. রুহুল আমিন বলেন, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব কেবল তথ্য প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, জনআলোচনা সৃষ্টি এবং ধারাবাহিক প্রচারের মাধ্যমে এফওপিএল সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ইতিবাচক চাপ তৈরি করা সম্ভব।
উন্মুক্ত আলোচনায় ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের প্রকল্প সমন্বয়কারী মাহবুবা রহমান জানান, বাংলাদেশে প্রস্তাবিত ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং বিধিমালার খসড়া বর্তমানে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রমাণভিত্তিক গণমাধ্যম প্রচার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ ইতিবাচক জনমত গড়ে তুলতে এবং নীতিগত অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কর্মশালায় প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ, যুব প্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনা শেষে অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশে কার্যকর এফওপিএল বাস্তবায়নে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নীতিমালা প্রণয়নে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি এবং এসডিজি-৩.৪ অর্জনে গণমাধ্যম, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।