মিয়ামিতে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই শক্তিশালী দল ইংল্যান্ড ও নরওয়ে। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এই ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শন।
একদিকে ব্রাজিলকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর নরওয়ে, অন্যদিকে শক্তিশালী স্কোয়াড ও আক্রমণাত্মক মাঝমাঠ নিয়ে ইংল্যান্ড। নরওয়ে এখন নতুন ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায়।
ম্যাচের আগে কোনো রাখঢাক না রেখেই নরওয়ের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড জানিয়েছেন, প্রতিপক্ষ হিসেবে ইংল্যান্ড অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও তাদের নিয়ে কোনো ভীতি নেই। উল্টো ব্রাজিলকে হারানোর পর দলের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। আজ দিবাগত রাত ৩টায় ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে।
কারা হতে পারেন ম্যাচের নায়ক। নরওয়ে কি আবারও কমপ্যাক্ট ডিফেন্স ও দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক দিয়ে ইংল্যান্ডকে চাপে ফেলতে পারবে? নাকি হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহ্যামের নেতৃত্বে ইংল্যান্ড ভেঙে দেবে নরওয়ের রক্ষণ?
একদিকে সেমিফাইনালে ফেরার স্বপ্নে বিভোর ইংলিশরা, অন্যদিকে ব্রাজিলকে বিদায় করে ইতিহাস গড়া নরওয়ে। হালান্ড-কেইনের গোলযুদ্ধ, মাঝমাঠের দখল, রক্ষণভাগের লড়াই এবং মিয়ামির তীব্র গরম, সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচ হতে যাচ্ছে এটি। ব্রাজিলকে হারিয়ে ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে ফিরে আসা নরওয়ে ইতোমধ্যে টানা দুই নকআউট ম্যাচ জিতে ইতিহাস গড়েছে। তবে এবার তাদের সামনে অপেক্ষা করছে ইংল্যান্ডের কঠিন চ্যালেঞ্জ।
ইংলিশরা চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠতে যেমন মরিয়া, তেমনি অষ্টমবারের মতো কোয়ার্টার-ফাইনাল থেকে বিদায় এড়ানোর লক্ষ্যও তাদের সামনে। ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে আর্লিং হালান্ড ও হ্যারি কেনের গোলযুদ্ধ। চার ম্যাচে সাত গোল করে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন হালান্ড। টানা ১৪ আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল করে তিনি দেশের হয়ে ৫৪ ম্যাচে ৬২ গোলের মালিক। অন্যদিকে কেনও ছয় গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে সমানতালে রয়েছেন।
প্রিমিয়ার লিগে বহুবার নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা এই দুই স্ট্রাইকারের মুখোমুখি লড়াই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। হালান্ডকে থামানোর দায়িত্ব পড়তে পারে ইংল্যান্ডের লম্বা ডিফেন্ডার ড্যান বার্নের কাঁধে। নিউক্যাসল তারকা ক্লাব ফুটবলে নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকারকে বেশ কয়েকবার সফলভাবে আটকে রেখেছেন।
ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে বার্নের বিপক্ষে আট ম্যাচে হালান্ড মাত্র একবার গোল করেছেন, যা ইংল্যান্ডকে কিছুটা আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে। মাঝমাঠেও অপেক্ষা করছে দারুণ এক লড়াই। নরওয়ের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড ব্রাজিলের বিপক্ষে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে দলের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তার বিপরীতে থাকবেন আর্সেনালে দীর্ঘদিনের সতীর্থ ডেকলান রাইস। একে অপরের খেলার ধরন সম্পর্কে দুজনেরই ভালো ধারণা থাকায় এই দ্বৈরথ ম্যাচের অন্যতম নির্ধারক হতে পারে। রক্ষণভাগের ডান পাশে ইংল্যান্ডের জন্য বড় প্রশ্ন রিস জেমসের ফিটনেস।
তিনি খেলতে না পারলে নরওয়ের দ্রুতগতির উইঙ্গার আন্তোনিও নুসা কিংবা বদলি হিসেবে দারুণ ছন্দে থাকা আন্দ্রেয়াস শেলডেরুপ সেই দিক দিয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারেন। ব্রাজিলের বিপক্ষে শেলডেরুপের নৈপুণ্যই নরওয়ের আক্রমণে নতুন গতি এনে দিয়েছিল। মিয়ামির আবহাওয়াও ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। প্রায় ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও উচ্চ আর্দ্রতার মধ্যে খেলতে হবে দুই দলকে। নরওয়ে টুর্নামেন্টে এমন পরিবেশে কয়েকটি ম্যাচ খেলায় কিছুটা অভ্যস্ত হলেও ইংল্যান্ডকে তুলনামূলক বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। সব মিলিয়ে হালান্ড-কেইনের গোলযুদ্ধ, ওডেগার্ড-রাইসের মাঝমাঠের লড়াই, রক্ষণভাগের কৌশল এবং মিয়ামির কঠিন আবহাওয়া; এই চার উপাদানই নির্ধারণ করতে পারে কে উঠবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে।
বিশ্বের অন্যতম এই সেরা দুই স্ট্রাইকারের মুখোমুখি এই লড়াই তাই ফুটবলপ্রেমীদের জন্য হতে যাচ্ছে এক উপভোগ্য মহারণ। নরওয়ের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচে নামার আগে বড় ধাক্কা ইংল্যান্ড শিবিরে। ম্যাচে অনিশ্চিত ডিফেন্ডার মার্ক গুয়েহি। প্রাক ম্যাচের চূড়ান্ত প্রস্তুতির শেষে তার চোট আরও একবার পরীক্ষা করা হবে। তারপরই জানা যাবে তিনি খেলার জন্য তৈরি কিনা। মরক্কোর বিরুদ্ধে রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পান গুয়েহি। এদিকে সুস্থ হওয়ার পথে ডেকলান রাইস।
হালান্ডদের বিরুদ্ধে নামার আগে রাইট ব্যাক পজিশন নিয়ে সমস্যায় থমাস টুখেল। মেক্সিকো ম্যাচে লালকার্ড দেখায় কোয়ার্টার ফাইনাল এবং সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড পাবে না জ্যারেল কোয়ানসাকে। বায়ার লেভারকুসেনের ডিফেন্ডারের অনুপস্থিতিতে ঘোর সমস্যায় ইংল্যান্ড। কারণ দুর্দান্ত ছন্দে আছেন আর্লিং হালান্ড। ইতিমধ্যেই সাত গোল করে ফেলেছেন। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে লিওনেল মেসি এবং কিলিয়ান এমবাপেকে তাড়া করছেন।
এদিকে আগেই ছিটকে গিয়েছেন জর্ডন হেন্ডারসন। মরক্কোর বিরুদ্ধে জয় উদযাপন করতে গিয়ে হাতের রিস্টে গুরুতর চোট পান ইংল্যান্ডের ফুটবলার। হাতে অস্ত্রোপচার হওয়ার পর বাড়ি না ফিরে, কানসাস সিটিতে ইংল্যান্ডের শিবিরে যোগ দেন। নরওয়ের এই গোলমেশিনকে আটকে রাখতে পারলেই জয়ের রাস্তা অনেকটাই সহজ হবে বলে মনে করছেন ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার নিকো ও রাইলি। তবে একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, নরওয়ে শুধু হালান্ডনির্ভর দল নয়।
ক্লাব ফুটবলে দুজনই ম্যানচেস্টার সিটির জার্সি গায়ে খেলেন। কিন্তু বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ও রাইলির সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব থাকবে নিজের ক্লাব সতীর্থ হালান্ডকে আটকানো। ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার মার্ক গেহিও নরওয়ের এই স্ট্রাইকারকে থামানোর কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়বেন। নরওয়ের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড খেলবেন ইংল্যান্ডের ডেকলান রাইস ও বুকায়ো সাকার বিরুদ্ধে।
ইংল্যান্ড ফরোয়ার্ড বুকায়ো সাকাও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের লক্ষ্য শুধু সেমিফাইনালে ওঠা নয়, বিশ্বকাপ জেতা। তার কথায়, অবশ্যই বিশ্বকাপ জেতাই আমাদের লক্ষ্য। তবে এখন পুরো মনোযোগ নরওয়ের ম্যাচে। সামনে এখনও তিনটি ম্যাচের পথ বাকি। মেক্সিকো ম্যাচের উত্তেজনা পেছনে ফেলে আমরা এখন শুধুই নরওয়েকে নিয়ে ভাবছি।
বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ১১ গোলের মধ্যে হ্যারি কেন ও জুড বেলিংহ্যাম মিলিয়ে করেছেন ১০টি। তবে সাকার বিশ্বাস, শুধু এই দুজন নন, ইংল্যান্ডের দলে একাধিক ম্যাচজয়ী ফুটবলার রয়েছেন, যারা যে কোনও সময় পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন।
সংবাদ সম্মেলনে ওডেগার্ড ইংল্যান্ডের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। তিনি বলেন, ইংল্যান্ডের ফুটবলারদের মান সম্পর্কে সবাই অবগত। তাদের দলে বিশ্বমানের খেলোয়াড় রয়েছে এবং এই মুহূর্তে তারা বিশ্বের অন্যতম সেরা জাতীয় দল। তবে কঠিন পরীক্ষা হলেও তিনি আন্ডারডগ তকমাকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। ব্রাজিল ম্যাচের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আন্ডারডগ হয়েও ব্রাজিলকে হারানোর পর তারা বুঝেছে ফুটবলে অসম্ভব বলে কিছু নেই।
নরওয়ের অনেক খেলোয়াড়ই ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে নিয়মিত খেলেন। ফলে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের খেলার ধরন ও শক্তি সম্পর্কে তাদের ভালো ধারণা রয়েছে। ওডেগার্ড মনে করেন, এটি ব্যক্তিগত লড়াই নয়, বরং পুরো দলের লড়াই। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রতিপক্ষকে বিশ্লেষণের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ইংল্যান্ড চতুর্থ স্থানে থাকলেও নরওয়ের অবস্থান এখন ১৯তম। টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ড অপরাজিত থাকলেও নরওয়ে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করেছে। ওডেগার্ড বলেন, আন্ডারডগ হিসেবে খেলায় কোনো আক্ষেপ নেই। প্রস্তুতির ওপর নজর রেখে নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবল খেলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন এই মিডফিল্ডার। দীর্ঘ ২৮ বছরের অপেক্ষা শেষে আবারও ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরছে নরওয়ে। একসময় ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে পরিচিত স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটি ১৯৯৮ সালের পর আর কখনো বিশ্বকাপ খেলতে পারেনি। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে দুর্দান্ত আধিপত্য দেখিয়ে সেই দীর্ঘ হতাশার অবসান ঘটিয়েছে ‘ল্যান্ডসলাগেট’। আর এই প্রত্যাবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন আধুনিক ফুটবলের দুই বড় তারকা- আরলিং হালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ড। একজন গোলমেশিন, অন্যজন সৃষ্টিশীলতার প্রতীক। তাদের নেতৃত্বেই নরওয়ের ফুটবলে তৈরি হয়েছে নতুন আশার আলো। অনেক সমর্থকের বিশ্বাস, এটাই নরওয়ের ইতিহাসের সেরা প্রজন্ম, যারা বিশ্বকাপে দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। পুরো ইউরোপে মাত্র চারটি দল শতভাগ জয় নিয়ে বিশ্বকাপে উঠতে পেরেছে, নরওয়ে তাদের একটি। নরওয়ের বর্তমান কোচ স্টালে সোলবাকেন শুধু একজন কোচ নন, নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসেরই অংশ। খেলোয়াড় হিসেবে ৫৮ ম্যাচ খেলেছেন জাতীয় দলের হয়ে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপেও ছিলেন দলে। আবার ইউরো ২০০০-এও প্রতিনিধিত্ব করেছেন দেশকে। ২০২০ সালে জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর ধীরে ধীরে বদলে দেন পুরো দলকে। তার অধীনে নরওয়ে এখন সংগঠিত, আক্রমণাত্মক এবং আত্মবিশ্বাসী। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এবার এক ভিন্ন আবেগের ম্যাচ অপেক্ষা করছে আর্লিং হালান্ডের জন্য। জন্ম ইংল্যান্ডে, পেশাদার ফুটবলেও খেলছেন ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে। সেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই এবার বিশ্বকাপের শেষ আটে লড়বে তার দেশ নরওয়ে। তাই ম্যাচটিকে বিশেষ বলেই আখ্যা দিয়েছেন এই তারকা স্ট্রাইকার।
মিয়ামিতে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে হালান্ড বলেন, এটি অবশ্যই খুব বিশেষ একটি ম্যাচ। আমি ইংল্যান্ডে খেলি, ইংল্যান্ডেই আমার জন্ম। সেখানে আমার অনেক সতীর্থও আছে। তাই ম্যাচটি ভিন্ন রকমের অনুভূতি দেবে। এটি উপভোগ্য হবে। গত চার মৌসুম ধরে ম্যানচেস্টার সিটির জার্সিতে খেলতে খেলতে তিনি প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হয়েছেন। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে নরওয়ে এবার ইতিহাস গড়ছে।
অন্যদিকে ইংল্যান্ড টানা তৃতীয় বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলেও ৬০ বছর ধরে কোনো বড় শিরোপা জিততে পারেনি। সেই চাপ ইংল্যান্ডের কাঁধেই তুলে দিতে চান হালান্ড, ইংল্যান্ড অবশ্যই শিরোপার অন্যতম দাবিদার। তাই আমি বলব, যতটা সম্ভব চাপ ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের ওপরই দিন।