২৫ লাখ মানুষ পানিবন্দী, ৩৫ প্রাণহানি

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে যেন এক ভয়াল জলদুর্যোগ। টানা পাঁচ দিনের মুষলধারে বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর পানি

2026-07-11T12:12:56+00:00
2026-07-11T12:12:56+00:00
  সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬,
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
পাহাড়ি ঢল ও প্লাবন
২৫ লাখ মানুষ পানিবন্দী, ৩৫ প্রাণহানি
শাকিল আহমেদ
শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ১২:১২ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে যেন এক ভয়াল জলদুর্যোগ। টানা পাঁচ দিনের মুষলধারে বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা এখন কার্যত পানির নিচে। কোথাও ঘরবাড়ি ডুবে গেছে, কোথাও ভেঙে পড়েছে বেড়িবাঁধ, আবার কোথাও পাহাড়ধসের আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন হাজারো মানুষ। 

সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। দুর্যোগ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির ও পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকায়। 

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, পটিয়া ও আনোয়ারা উপজেলায়। সাতকানিয়ার প্রায় সব ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার গ্রাম পানির নিচে চলে গেছে। ডলু নদীর বাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকায় পানি প্রবেশ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবার বাড়ির ছাদে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিংবা উঁচু সড়কে আশ্রয় নিয়েছে। গবাদিপশু, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সামান্য খাদ্যসামগ্রী নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন হাজারো মানুষ।

লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশেও একই চিত্র। বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, মাছের ঘের, গ্রামীণ সড়ক ও বাজার তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে দুর্গত মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের যোগাযোগে সৃষ্টি হয়েছে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা।

কক্সবাজারে মৃত্যু মিছিল, পাহাড়ধসে শিশু নিহত : কক্সবাজারে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় চকরিয়া, মাতামুহুরী, পেকুয়া ও রামুর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অন্তত তিন লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। 

গত ১০ দিনে পাহাড়ধস ও বন্যাসংক্রান্ত ঘটনায় ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। এরই মধ্যে- কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ১৫ জন, কক্সবাজার শহরে দুইজন, চকরিয়ায় দুইজন এবং পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় একজন করে রয়েছেন। এ ছাড়া নিহত অন্যরা চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দা। 

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের মোহছেনিয়াকাটা এলাকায়। গভীর রাতে পাহাড়ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় চাপা পড়ে প্রাণ হারায় দুই চাচাতো-জেঠাতো ভাইবোন, দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুমি আক্তার (১৫) এবং চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র মোহাম্মদ তৌসিফ (১০)। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে পার্বত্য তিন জেলা : বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের আশঙ্কা মারাত্মকভাবে বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করছে প্রশাসন। 

ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবীরা সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে দিন-রাত কাজ করছেন। উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ইতোমধ্যে দুই শতাধিক ছোট-বড় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। ফলে নতুন করে প্রাণহানির আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

পানির নিচে ফসল, ভেসে গেছে মাছের ঘের : এই বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষি খাত। আমনের বীজতলা, সবজিক্ষেত, পানের বরজ ও হাজার হাজার একর কৃষিজমি পানির নিচে চলে গেছে। চিংড়ি ও মাছের ঘের ভেসে যাওয়ায় কৃষক ও মৎস্যচাষিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সাহারবিলের কৃষক মনির আহমেদ বলেন, এক বছরের স্বপ্ন কয়েক ঘণ্টার পানিতে শেষ হয়ে গেছে। বীজতলা নেই, সবজিক্ষেত নেই।

খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবায় তীব্র সংকট : বন্যাকবলিত এলাকায় সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে নিরাপদ পানীয় পানি ও স্বাস্থ্যসেবায়। অধিকাংশ টিউবওয়েল পানির নিচে চলে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির অভাব তীব্র হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শিশু খাদ্য, ওষুধ ও স্যানিটেশন সুবিধাও সীমিত। স্বাস্থ্য বিভাগ জরুরি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রেখেছে। পাশাপাশি ডায়রিয়া, জন্ডিস ও অন্যান্য জলবাহিত রোগ প্রতিরোধে বিশেষ নজরদারি শুরু হয়েছে।

হাজারের বেশি আশ্রয়কেন্দ্র, চলছে উদ্ধার অভিযান : দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে ১ হাজার ৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সেখানে ইতোমধ্যে প্রায় ১২ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস, বিজিবি ও পুলিশ যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে। দুর্গত এলাকায় অতিরিক্ত স্পিডবোট, নৌকা ও উদ্ধার সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি চাল, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য ও জরুরি ওষুধ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। 

নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে : পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কয়েকটি বেড়িবাঁধ উপচে নতুন নতুন এলাকায় পানি প্রবেশ করছে। যদিও বড় ধরনের বাঁধ ধসের খবর পাওয়া যায়নি, তবে পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত পাঁচ দিনে কক্সবাজারে ৫৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী কয়েক দিনও ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে নতুন করে প্লাবন ও পাহাড়ধসের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

স্থগিত এইচএসসি পরীক্ষা : এদিকে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার শনিবারের এইচএসসি ও সমমানের সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আলিম, এইচএসসি বিএমটি, ভোকেশনাল ও ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষাও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন এলাকায় মাইকিং করে পরীক্ষার্থীদের বিষয়টি জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সরকারের জরুরি উদ্যোগ : সরকার জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বিভাগের ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ জেলার জন্য ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে সেনাবাহিনীর সহায়তায় উদ্ধার কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে।

দুর্যোগকবলিত এলাকার সার্বক্ষণিক তদারকির পাশাপাশি জেলা প্রশাসক, ইউএনও এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয় রাখা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে রাজনৈতিক দল, জনপ্রতিনিধি এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকেও মাঠে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


  বিষয়:   চট্টগ্রাম  জলদুর্যোগ  পাহাড়ি ঢল  নদ-নদী 


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: