চার দশক আগে বিশ্বকাপের শেষ আটে হওয়া স্মরণীয় লড়াইয়ের পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে এবার। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত এই ম্যাচ, যেখানে সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মাঠে নামবে স্পেন ও বেলজিয়াম।
উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত চলতি বিশ্বকাপে দুই দলই গ্রুপপর্বে অপরাজিত থেকে নিজেদের গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়। এরপর শেষ ষোলোর বাধাও সফলভাবে পেরিয়ে এখন শেষ চারের টিকিটের জন্য লড়বে ইউরোপের এই দুই পরাশক্তি। তবে চলতি বিশ্বকাপে দুরন্ত ছন্দে রয়েছে লা রোজারা। শেষ ষোলোতে অন্যতম ফেভারিট পর্তুগালকে অন্তিম মুহূর্তের গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে স্পেন।
অন্যদিকে আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে কার্যত উড়িয়ে দিয়ে শেষ আটের টিকিট জোগাড় করে বেলজিয়াম। স্বাভাবিকভাবেই তাই এই ম্যাচে নামার আগে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে রয়েছে রেড ডেভিলসরা।
তবে, শেষ ম্যাচে কিছুটা কষ্টার্জিত জয় পেলেও পিছিয়ে রাখা যাবে না স্প্যানিশ আর্মাডাকে। এবারের বিশ্বকাপে এখনও একটিও গোল হজম করেনি লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। যা নিঃসন্দেহে আত্মবিশ্বাস জোগাবে ইয়ামাল, পেদ্রি, ফেরান তোরেসদের। যদিও, কাগজে-কলমে কিছুটা হলেও এগিয়ে রয়েছে স্পেন। কিন্তু, বেলজিয়ামকেও হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। গ্রুপ পর্বে তেমন নজরকাড়া পারফরম্যান্স করতে না পারলেও নকআউটে নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিয়েছে তারা। সেনেগালের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ৩-২ ব্যবধানে জয়ের পর আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে একপ্রকার উড়িয়ে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে রুডি গার্সিয়ার দল।
এদিকে, পরিসংখ্যান অবশ্য কিছুটা হলেও স্পেনকে স্বস্তি দেবে। বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে নামার আগে এই দুই দল বেশ কয়েকবার একে ওপরের মুখোমুখি হয়েছে। সেখানে দাপট দেখিয়েছে লা রোহা রা। শেষবার ২০১৬ সালে মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই দল। ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে ২-০ গোলে সহজ জয় পেয়েছিল স্পেন।
মাঠের লড়াইয়ে নামার আগে অনুশীলনের মাঠ নিয়ে বেশ ক্ষুব্ধ বেলজিয়াম শিবির। এজন্য, ফিফার কাছে অভিযোগও জানিয়েছে রেড ডেভিলসরা । লস অ্যাঞ্জেলেসের লয়োলা মেরিমাউন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে অনুশীলন করছিল বেলজিয়াম। কিন্তু, রয়েল বেলজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের দাবি মাঠটি আন্তর্জাতিক মানের নয়। পাশাপাশি, এই মাঠে অনুশীলন করলে ফুটবলারদের চোট পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বেলজিয়ামের অভিযোগের ভিত্তিতে ফিফা রোমেলো লুকাকু, কেভিন দে ব্রুইনদের অনুশীলন ভেন্যু পরিবর্তন করেছে। বর্তমানে তারা মেজর লিগ সকারের ক্লাব লস অ্যাঞ্জেলেস গ্যালাক্সির মাঠে অনুশীলন করছে। তবে ফিফার এই সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে লয়োলা মেরিমাউন্ট বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের দাবি, সুলিভান ফিল্ডে নিয়মিত পেশাদার দলগুলো অনুশীলন করলেও মাঠের মান নিয়ে এর আগে কখনও অভিযোগ ওঠেনি। তবে, আপাতত এইসব বিতর্ককে সরিয়ে রেখে সেমিফাইনালের টিকিট জোগাড় করতে মরিয়া বেলজিয়াম।
শুরুর বিবর্ণতা ঝেড়ে, একটু একটু করে নিজেদের ফিরে পাচ্ছে বেলজিয়াম। ক্রমোন্নতির ধারা আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে থিবো কোর্তোয়াকেও। অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষকের মনে বিশ্বাস জন্মাতে শুরু করেছে, স্পেনকে হারিয়ে, সবাইকে চমকে দিয়ে, তারা উঠতে পারেন উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। লস অ্যাঞ্জেলেসে, আগামীকাল মুখোমুখি হবে দুই দল।
২০১০ সালের পর দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে আসা স্পেন, এবারও ফেভারিট দলগুলোর একটি। গ্রুপের মলিনতা ঝেড়ে শিরোপার দাবিদার হয়ে উঠছে বেলজিয়ামও। মিশর ও ইরানের বিপক্ষে ড্রয়ের ধাক্কা সামলে, নিউজিল্যান্ডকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে গ্রুপ পেরিয়েছিল বেলজিয়াম।
নকআউট পর্বের শুরুতে সেনেগালের বিপক্ষে দলটি জিতেছিল ৩-২ ব্যবধানে; দুই গোলে পিছিয়ে থাকার পর ঘুরে দাঁড়িয়ে। শেষ ষোলোয় বেলজিয়াম ফেরে চেনা ছন্দে। বিশ্বকাপের আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রকে স্রেফ খঁড়কুটোর মতো উড়িয়ে দেয় ৪-১ গোলে। কোর্তোয়ার মনে হচ্ছে, ধীরে ধীরে নিজেদের ছন্দ ও বিশ্বাস ফিরে পাচ্ছে দল। স্পেনকে হারানো তাই তাদের পক্ষে অসম্ভব নয় মোটেও।
দলের সবাই উপলব্ধি করছে, এটা (স্পেনের বিপক্ষে জেতা) সম্ভব। আমি মনে করি, আমাদের শক্তিশালী একটা স্কোয়াড আছে এবং সেটা স্পেনকে গোনায় ধরতে হবে।
সব প্রতিযোগিতায় বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে, ইউরোপা লিগে, বিশ্বকাপে। আমি মনে করি, বিস্ময় উপহার দেওয়া দলগুলোর একটি হতে পারি আমরা। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের বিদায় করে দিতে পারাটা অবশ্যই বিশাল অঘটন হবে। আমাদের সেটা ঘটানোর আত্মবিশ্বাস আছে। এই ম্যাচে অবশ্য স্পেনের পক্ষে বাজি ধরার লোক বেশি। কোর্তোয়াও তা জানেন। ৩৪ বছর বয়সী অভিজ্ঞ এই গোলকিপারও ইয়ামাল-ওইয়ারসাবালদের রাখলেন এগিয়ে। তবে নিজেদের প্রতি আস্থার কমতি নেই তার।
মানুষ আমাদের প্রতি একটু হতাশ ছিল, কিন্তু আমরা সেটা ঠিক করে নিয়েছি। ভালো থেকে আরও ভালো হচ্ছে আমাদের পারফরম্যান্স। অবশ্যই স্পেন ফেভারিট, বলের নিয়ন্ত্রণে তারা চমৎকার এবং বল হারালে তারা দ্রুত চাপ দেয়। মূল কৌশলও এখানে: এসময় তাদের রক্ষণের পেছনের ফাঁকা জায়গাটা কিভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটা জানা। শেষ ষোলোয় অবশ্য স্পেনের জয়টি অনায়াস ছিল না। বদলি মিকেল মেরিনোর দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ের একমাত্র গোলে জিতেছিল তারা। তবে, ‘লা রোজা’দের আক্রমণভাগ নিয়ে সতর্ক কোর্তোয়া।
আমি মনে করি, পর্তুগালের বিপক্ষে গোলটি দেখাচ্ছে তাদের শক্তি। আমরা জানি, ওয়ান অন ওয়ান পরিস্থিতিতে লামিন ইয়ামাল অবিশ্বাস্য মেধাবী, সে ভীষণ ক্ষিপ্র এবং প্রয়োজনে দুই জনকে সহজে কাটাতে পারে।
ইয়ামালদের বিপক্ষে ম্যাচে, বেলজিয়াম আস্থার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে কোর্তোয়ার দিকে। কেবল সময়ের সেরা ও অভিজ্ঞ গোলকিপারদের একজনই নন তিনি, লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলকে তিনি চিনেন অনেকের চেয়ে বেশি! আতলেতিকো মাদ্রিদ ও রিয়াল মাদ্রিদ মিলিয়ে যে ১১টি বছর কোর্তোয়া কাটিয়ে দিয়েছেন, স্পেন তার কাছে দ্বিতীয় বাড়ি।
আমি স্পেনে ১১ বছর আছি। অবশ্যই, এটা অনেক সময়। সেখানে জীবন কিছুটা ধীর গতির, আবহাওয়া ভালো, কিন্তু আমি বেলজিয়ামেরই রয়ে গেছি। যদিও, স্পেন আমার দ্বিতীয় বাড়ি এবং সম্ভবত ক্যারিয়ার শেষে, সেখানে থিতু হব।
আমার ছেলে বাচ্চা স্বাভাবিকভাবেই বেলজিয়ানের চেয়ে বেশি স্প্যানিশ। কিন্তু দিন শেষে, আগামীকালের ম্যাচে আমি বেলজিয়ানই। অতীতের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইতিহাস স্পষ্টভাবেই স্পেনের পক্ষে কথা বলছে। দুই দল প্রথমবার মুখোমুখি হয়েছিল ১৯২১ সালে। এরপর আন্তর্জাতিক ফুটবলে মোট ২২ বার একে অপরের বিপক্ষে খেলেছে তারা।
মুখোমুখি পরিসংখ্যানে মোট ম্যাচ ২২টি। এর মধ্যে স্পেনের জয় ১২টি, বেলজিয়ামের জয় ৫টি এবং ড্র হয়েছে ৫টি। সব মিলিয়ে মুখোমুখি লড়াইয়ে স্পেনের আধিপত্য স্পষ্ট। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে স্পেনের বিপক্ষে কোনো জয় পায়নি বেলজিয়াম। দুই দলের সর্বশেষ পাঁচটি সাক্ষাতেই জয় পেয়েছে স্পেন। সর্বশেষ ২০১৬ সালের আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচেও বেলজিয়ামকে ২-০ গোলে হারিয়েছিল লা রোজা।
সাম্প্রতিক এই ধারাবাহিক সাফল্য স্পেনকে মানসিকভাবে কিছুটা এগিয়ে রাখলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে বেলজিয়ামের রয়েছে বিশেষ এক স্মৃতি।
বিশ্বকাপে এর আগে দুইবার দেখা হয়েছে বেলজিয়াম ও স্পেনের।
প্রথমবার ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। সেই ম্যাচে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় শেষে ১-১ সমতা থাকায় খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ৫-৪ ব্যবধানে জয় পেয়ে ইতিহাস গড়ে সেমিফাইনালে ওঠে বেলজিয়াম। চার বছর পর ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে আবার মুখোমুখি হয় দুই দল।
এবার ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে আগের হারের প্রতিশোধ নেয় স্পেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে দুই দলই দুইবার করে সেমিফাইনালে খেলেছে। স্পেন সর্বশেষ ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপ জিতে শিরোপা ঘরে তোলে।
অন্যদিকে বেলজিয়াম সর্বশেষ ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছিল। চলতি আসরে বেলজিয়াম আক্রমণভাগে দারুণ কার্যকর ফুটবল খেলছে।
সেনেগালের বিপক্ষে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে বড় জয় দলটির আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। চাপের মুখে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতাও দেখিয়েছে তারা। স্পেনও টুর্নামেন্টজুড়ে ভারসাম্যপূর্ণ ফুটবল খেলছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে একতরফা জয় এবং পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে জয়ের মাধ্যমে দলটি প্রমাণ করেছে, তারা কঠিন পরিস্থিতিতেও ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। স্পেনের হয়ে আক্রমণভাগে মিকেল মেরিনোসহ একাধিক তারকা ফুটবলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
অন্যদিকে বেলজিয়ামও নিজেদের অভিজ্ঞ ও তরুণ ফুটবলারদের সমন্বয়ে শক্তিশালী এক দল গড়ে তুলেছে। দুই দলের মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণ ম্যাচের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অতীতের পরিসংখ্যান স্পেনকে এগিয়ে রাখলেও বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে বেলজিয়ামের স্মৃতি সুখকর। ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক জয় এখনও রেড ডেভিলসের আত্মবিশ্বাসের বড় উৎস।
অন্যদিকে স্পেন চাইবে দীর্ঘদিনের মুখোমুখি আধিপত্য ধরে রেখে আরও একবার সেমিফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করতে।
ফলে ইতিহাস, বর্তমান ফর্ম এবং দুই দলের মানসিক দৃঢ়তা সব মিলিয়ে বেলজিয়াম-স্পেন কোয়ার্টার ফাইনালটি হতে যাচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় ও হাইভোল্টেজ লড়াই।