টানা পাঁচ দিনের ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জলাবদ্ধতায় সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেন, জেলার ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং দুর্গত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব তথ্য জানান।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে জেলার অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা, যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এছাড়া চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাও প্লাবিত হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, মানুষের জীবনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য অসচেতনতার কারণেও যেন কোনো প্রাণহানি না ঘটে, সে জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি জানান, জেলার প্রতিটি উপজেলায় এবং জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু রেখে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য নিয়মিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হচ্ছে এবং সেখান থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা নেওয়া হচ্ছে।
ত্রাণ কার্যক্রম সম্পর্কে জেলা প্রশাসক বলেন, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। প্রথম দফার বরাদ্দ ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। নতুন বরাদ্দও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের চাহিদার ভিত্তিতে দ্রুত বিতরণ করা হবে, যাতে কোনো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ খাদ্যসংকটে না পড়েন।
উদ্ধার কার্যক্রম আরও জোরদার করতে সাতকানিয়ার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ১০টি স্পিডবোট প্রয়োজন বলে জানান জেলা প্রশাসক। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগও করা হয়েছে। স্পিডবোট পাওয়া গেলে উদ্ধারকাজ আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে। আপাতত নৌকার মাধ্যমে উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি জানান, জেলা প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, রেড ক্রিসেন্ট, ইফসা, আনসার বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে বিশেষ উদ্ধার ও ত্রাণ দল গঠন করা হয়েছে। এসব দল দুর্গত এলাকায় দ্রুত পৌঁছে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
পাহাড়ধসে প্রাণহানি রোধে নিজেও মাঠপর্যায়ে কাজ করার কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, তিনি লালখান বাজার, পোড়া পাহাড় ও ১ নম্বর ঝিলসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করেছেন। সেখানে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, জেলার ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে চিড়া, মুড়ি, গুড়, শিশুদের জন্য মাফিন, কেক, বিস্কুট, ওরস্যালাইন এবং পাঁচ লিটার করে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবাও নিশ্চিত করা হয়েছে। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলায় ইতোমধ্যে প্রায় আট হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, প্রতিটি উপজেলায় পৃথক কন্ট্রোল রুম এবং জেলা প্রশাসনের কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম ২৪ ঘণ্টা চালু রয়েছে। সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। তিনি সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, মানবিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।