পাহাড়ে মৃত্যুর বিভিষিকা

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

বর্ষা এলেই পাহাড় যেন নতুন করে মৃত্যুর বার্তা নিয়ে দাঁড়ায়। টানা বৃষ্টিতে নরম হয়ে যাওয়া পাহাড়ের বুক হঠাৎ ভেঙে পড়ে

2026-07-07T10:42:51+00:00
2026-07-07T10:42:51+00:00
  সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬,
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
থামছে না ঝুঁকির বসতি
পাহাড়ে মৃত্যুর বিভিষিকা
শাকিল আহমেদ
মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬, ১০:৪২ এএম 
সংগৃহীত ছবি
বর্ষা এলেই পাহাড় যেন নতুন করে মৃত্যুর বার্তা নিয়ে দাঁড়ায়। টানা বৃষ্টিতে নরম হয়ে যাওয়া পাহাড়ের বুক হঠাৎ ভেঙে পড়ে মুহূর্তেই চাপা পড়ে যায় ঘরবাড়ি, নিভে যায় অসংখ্য প্রাণ। প্রতিবছরের মতো এবারও সেই পুরোনো আতঙ্ক ফিরে এসেছে। মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাবে টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারজুড়ে দেখা দিয়েছে পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকি। 

একদিকে চট্টগ্রামে প্রশাসনের মাইকিং ও সরিয়ে নেওয়ার অভিযান, অন্যদিকে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসে ৯জনের জনের মৃত্যু, দুই চিত্রই স্পষ্ট করে দিচ্ছে, বাংলাদেশ এখনও পাহাড়ধস মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধান থেকে অনেক দূরে।

গতকাল সোমবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম নগরের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকাগুলোতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। আগের রাতেও একই ধরনের প্রচারণা চালানো হয়। পাহাড়সংলগ্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মাদ্রাসাকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধারকারী দল ও স্বেচ্ছাসেবকরাও মাঠে অবস্থান করছেন।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, আকবরশাহ, বিজয়নগর, শান্তিনগর, বেলতলীঘোনা, টাংকির পাহাড়, পাহাড়িকা, মিয়ার পাহাড়, মতিঝর্ণা, লালখান বাজার, ঢেবারপাড়, আমবাগান, উত্তর হালিশহরসহ বহু এলাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। এসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ বসতি।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তার পর আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মানুষের জীবন রক্ষায় প্রশাসনের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে এবং প্রয়োজনে জোরপূর্বকও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা খালি করা হবে।

চার বিভাগে অতিভারী বর্ষণ, বাড়ছে উদ্বেগ : আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। কোথাও কোথাও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১৮০ মিলিমিটারেরও বেশি হতে পারে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে পাহাড়ের মাটি দ্রুত পানি শোষণ করে ভারী হয়ে যায়। এতে পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ চাপ বেড়ে গিয়ে বড় অংশ ধসে পড়ে। একই সঙ্গে নগরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও বাড়ে।

এদিকে উত্তর বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। গভীর সমুদ্রে থাকা মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আবারও মৃত্যু : প্রশাসনের সতর্কতার মধ্যেই কক্সবাজারের উখিয়ায় ঘটে গেছে আরেকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। রোববার গভীর রাতে কুতুপালং, জামতলী ও বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক পাহাড়ধসে নারী-শিশুসহ ৯জন নিহত হন। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গভীর রাতে প্রবল বর্ষণের মধ্যে হঠাৎ পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ে। অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে থাকায় বের হওয়ার সুযোগই পাননি। উদ্ধারকারীরা মাটি সরিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন। উখিয়া উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, আগেই মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছিল। তবুও অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে রাজি হয়নি অথবা যাওয়ার সুযোগ পায়নি।

লাখো মানুষের মাথার ওপর ঝুলছে একই বিপদ : বিশ্বের বৃহত্তম রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি মানুষের বসবাস। ২০১৭ সালের পর দ্রুত আশ্রয় গড়ে তুলতে হাজার হাজার একর পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছে বসতি, রাস্তা ও বিভিন্ন অবকাঠামো। ফলে পুরো এলাকাটিই এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি ক্যাম্পের অন্তত ৯টি পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা এখনও পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে বসবাস করছেন। ক্যাম্পের লার্নিং সেন্টারগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তর করা হলেও সবার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ফলে বহু পরিবার বাধ্য হয়েই ঝুঁকিপূর্ণ ঘর ছেড়ে যেতে পারছে না।

কেন বারবার ঘটছে পাহাড়ধস? বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ধসের মূল কারণ শুধু অতিবৃষ্টি নয়। বছরের পর বছর অবৈধভাবে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নিষ্কাশনব্যবস্থা ধ্বংস এবং পাহাড়ের ঢালে ভারী স্থাপনা নির্মাণ পাহাড়কে দুর্বল করে তুলেছে।

চট্টগ্রামে নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে পাহাড় ঘেঁষা এলাকায় বসতি গড়েছেন। একই চিত্র দেখা যায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও। ফলে অতিবৃষ্টি হলেই পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে ধসে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন স্বল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টির ঘটনা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এতে ভবিষ্যতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।

২০২৫ সালেও ছিল প্রাণহানি : গত বছরও চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে একাধিক পাহাড়ধসে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। বিশেষ করে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে প্রায় প্রতি বর্ষাতেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। প্রতিবছর বর্ষা শুরুর আগে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হলেও স্থায়ী পুনর্বাসনের গতি খুবই ধীর।

প্রশাসনের চ্যালেঞ্জ : সরকারি সংস্থাগুলো প্রতিবছর উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখে, আশ্রয়কেন্দ্র খোলে এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করে। কিন্তু বাস্তবে অনেক পরিবার জীবিকার কারণে কিংবা বিকল্প বাসস্থানের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাই ছাড়তে চায় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল দুর্যোগের সময় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থায়ীভাবে সরিয়ে নেওয়া, পাহাড় কাটা বন্ধ করা, বনায়ন বাড়ানো এবং আধুনিক আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণ ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে দুর্যোগ সচেতনতা আরও বাড়ানো জরুরি।

জানতে চাইলে রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, জেলায় চলতি বছর শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্ষণের পূর্বাভাস থাকলে আমরা তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসি। স্থায়ী সমাধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পার্বত্য জেলায় ভূমি ব্যবস্থাপনার কারণে এখানে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া একটু জটিল। তবে প্রশাসন থেকে ঝুঁকি হ্রাসে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।

সময় থাকতে সতর্ক হওয়ার আহ্বান : আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী দুই দিনও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িসহ দেশের পাহাড়ি এলাকায় যেকোনো সময় নতুন করে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটতে পারে। 

প্রশাসনের আহ্বান স্পষ্ট, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢাল বা পাদদেশে অবস্থান না করে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতে হবে। কারণ পাহাড়ধসের আগে খুব বেশি সময় সতর্ক হওয়ার সুযোগ থাকে না। একটি মুহূর্তের সিদ্ধান্তই বাঁচাতে পারে একটি পরিবার, একটি জীবন।

প্রতি বর্ষায় একই ধরনের প্রাণহানি প্রমাণ করে, পাহাড়ধস আর বিচ্ছিন্ন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি এখন পরিবেশ ধ্বংস, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবিক সংকটের সম্মিলিত ফল। তাই শুধু বর্ষাকালীন প্রস্তুতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপদ পুনর্বাসনের মাধ্যমেই এ দুর্যোগের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: