রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা গণপরিবহন। চাহিদামতো গণপরিবহন না থাকায় নানা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। তারা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে গণপরিবহনে উঠলেও ঠিকমতো গণপরিবহনে চলাচল করতে পারছে না।
যেসব যাত্রী তরুণ এবং শারীরিকভাবে সক্ষম তারা কোনোরকমে বাসে উঠতে পারলেও নারী, শিশু এবং বয়স্কদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়ছে। রাজধানীর সড়কে যে কয়টি গণপরিবহন চলছে তার অধিকাংশই জরাজীর্ণ।
এছাড়া, গণপরিবহনগুলোর বিশৃঙ্খলা-নৈরাজ্য অব্যাহত থাকলেও তার লাগাম টানতে পারছে না সরকার। নিয়ন্ত্রণহীন থাকায় চালকরা কোন ধরনের নিয়ম কানুনও মানছে না। বিশেষ করে নির্ধারিত স্থানে বাসগুলো না থামিয়ে যাত্রীদের উঠা নামা করানো হচ্ছে। এতে প্রায় দুর্ঘটনা ঘটছে। ফলে অকালে মৃত্যুসহ সারাজীবন পঙ্গুত্ববরণ করতে হচ্ছে অনেককে। এর মাশুল গুনতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোকেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা শহরে নিবন্ধিত মোট যানবাহনের মধ্যে গণপরিবহণ মাত্র ১১ শতাংশ। ব্যক্তিগত গাড়ির অনুপাতে গণপরিবহণের সংখ্যা বাড়ছে না। জনবান্ধব নগর যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার সীমিত করে বহু মাধ্যমভিত্তিক সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে নগর এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়ির পরিমাণ সুনির্দিষ্ট করা, ব্যক্তিগত গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে।
একইসঙ্গে কার ফ্রি স্কুল জোন গড়ে তোলা, পথচারীবান্ধব রাস্তা তৈরি, বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের সেবা ও পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে। না হয় সংকট আরো বাড়বে। তবে এসব সংকট সমাধানে গণপরিবহনগুলোকে একাধিকবার এক ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ নেয়া হলেও বারবার ব্যর্থ হয়েছে বিগত সরকার।
গত অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে গণপরিবহনগুলোকে ফের একক ব্যবস্থায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তবে এ উদ্যোগও বাস্তবায়ন হয়নি।
মূলত ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক রুটভিত্তিক কোম্পানির অধীনে বাস চালানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
তিনি মারা গেলে ২০১৭ সালে বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির দায়িত্ব পান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র সাঈদ খোকন। তিনি ১১টি সভা করেছেন। এরপর সংস্থাটির সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস কমিটির দায়িত্ব পান। তার আমলে ২৭তম সভা পর্যন্ত হয়। ২০২১ সালে চালু হয় ঢাকা নগর পরিবহন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক ও বর্তমান প্রশাসকের সভাপতিত্বে কমিটির একাধিকবার সভা হয়। সভায় বাস রুট রেশনালাইজেশন ঢেলে সাজানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি নেই। তবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে চেষ্টা ছিল ধীরে ধীরে পুরো রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থা একটি কোম্পানির আওতায় আনা।
এছাড়া ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় বাস সড়ক থেকে তুলে নিয়ে আধুনিক মানের বাস নামানো, শহরের বাইরের চারিদিকে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল, ডিপো নির্মাণ করা।
ঢাকার জন্য কোম্পানিভিত্তিক বাস সেবা প্রবর্তনের রূপরেখা তৈরি করে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। বাসগুলো পরিচালনার দায়িত্বে থাকার কথা ছিল নির্দিষ্ট কোম্পানির। বর্তমানে রাজধানীর ২৯১টি রুটে চলাচল করা বাসের সংখ্যা নয় হাজার ২৭টি।
ঢাকার জন্য কোম্পানিভিত্তিক বাস সেবা প্রবর্তনের যে রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল তাতে বাসের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছিল সাত হাজার ৩৩৫টি। কিন্তু সব উদ্যোগই যেন ধমকে আছে।
এদিকে, গত অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে নৈরাজ্য বন্ধে নতুন করে একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তখন গোলাপি রঙের বাসসেবা চালু করা হয়েছিল। কিন্তু এক সপ্তাহের মাথায় তা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর থেকে নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই চলছে সব গণপরিবহন।
এর ফলে যাত্রীরা প্রতিদিন জ্যাম, দুর্ঘটনা, ভাড়ায় প্রতারণা এবং নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকায় গণপরিবহনে নৈরাজ্যসহ বিশৃঙ্খলা চলছেই। বিশেষ করে অধিকাংশ বাসে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বাড়তি নিচ্ছে। কেউ কম ভাড়া দিতে চাইলে চালক ও সহকারীর দুর্ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন। এতে যাত্রীরা বেশি ভাড়া দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
এছাড়া, নির্ধারিত স্থানে ঘন্টার পর ঘন্টা যাত্রীরা দাড়িয়ে থাকলেও বাসগুলো সেখানে থামছে না। যেখানে ইচ্ছে সেখানেই দীর্ঘ সময় বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠাচ্ছে ও নামাচ্ছে। এতে কৃত্রিম যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। আবার মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে চলন্ত অবস্থায়ও বাসে যাত্রীরা ওঠানামা করছে। এতে প্রায় দুর্ঘটনা ঘটছে।
এতো দুর্ঘটার খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ার পরেও চালকরা আগের মতোই বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাচ্ছে। রাজধানীর অধিকাংশ পরিবহন চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। অনেক হেলপার গাড়ি চালাচ্ছে। এতে তারা কোন নিয়মকানুন মানছে না। ফলে প্রায় ঘটছে দুর্ঘটনা।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপবিহণের নৈরাজ্য বন্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার বিকল্প নেই। এ বিষয়ে আরো কঠোর আইন করে দোষীদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসলে এ সমস্যা সমাধান হবে। তবে বর্তমানে ৯০ ভাগ দূর্ঘটনা ঘটছে অদক্ষ বাস চালকদের পাশাপাশি পথচারীদের অসচেতনতার কারণে। এ সমস্যা সমাধানের পথচারীদেরও সচেতন হতে হবে।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মিজানুর রহমান বলেন, দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার পরিচালনা, সরবরাহ ও আইনগত অনেক ত্রুটি রয়েছে। এ ত্রুটিগুলোর সমাধান ছাড়া পরিববহন ব্যবস্থার উন্নতি করা সম্ভব হবে না। তবে সব গণপরিবহনকে একক ব্যবস্থায় আনার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা সফল হলে সব ধরনের এ খাতের সব নৈরাজ্য বন্ধ হবে। এতে বাস মালিক চালক ও যাত্রী সবাই সুফল পাবে। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন বড় কঠিন।