দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় গত মাসে আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৯৫৪ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন আরও ১৬ হাজার ৫৯২ জন। ভয়াবহ সেই ভূমিকম্পের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৯৪২টি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে দেশটির সরকার।
শনিবার (৪ জুলাই) দেশটির যোগাযোগ ও তথ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে আনাদোলু এজেন্সি।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৬২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ৮৬ হাজার ১১৭টি পরিবারকে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ভূমিকম্পে মোট ৮৮৫টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৮৯টি ভবন সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকর্মী অংশ নিয়েছেন। এছাড়া রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ৩০ হাজার কর্মীকে দুর্গত এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৬৭০ কোটি ডলারের বেশি বলে জানিয়েছে ইউএনডিপি। এমন পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ৯০০ সামরিক সদস্য মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, গত ২৪ জুন দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। দুটি ভূমিকম্পের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৩৯ সেকেন্ড।
ভেনেজুয়েলার যোগাযোগ ও তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভয়াবহ সেই ভূমিকম্পের পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৯৪২টি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে, গত মাসের ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার জোড়া এই ভূমিকম্পের কারণে ভেনেজুয়েলায় প্রায় ৬৭০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি ছিল এক শতাব্দীর বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূকম্পন।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এখনও প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এই দুটি ভূমিকম্প তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলায় বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। কয়েক দশকের অর্থনৈতিক সংকটে দেশটির অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আগেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
এদিকে, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে খাবারের অপেক্ষায় থাকা লা গুয়ারিয়ার ১৮ বছর বয়সী বিক্রেতা দানিয়েল আরমাস বলেন, এখানে খাবার দেওয়া হয়, কিন্তু কখনও কখনও মানুষ খাবারের জন্য প্রায় একে অপরকে মেরে ফেলার অবস্থায় চলে যায়। যেন মোরগের লড়াই।
চুরি ও লুটপাটও বেড়েছে। বুধবার ধ্বংসস্তূপ থেকে মূল্যবান সামগ্রী চুরির অভিযোগে চার পুলিশ সদস্যকে স্থানীয়দের সহায়তায় গ্রেফতার করা হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মিশন প্রধান লিয়া পোগগিও বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন।
ত্রাণের লাইনে প্রতিদিন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। অনেকেই স্বেচ্ছাসেবক ও সাধারণ মানুষের সহায়তায় টিকে আছেন। লা গুয়ারিয়ায় বহুতল ভবন ধসে পড়ার পর পরিবার নিয়ে একটি পার্কিং এলাকায় আশ্রয় নেওয়া ৫৬ বছর বয়সী ফাতিমা বেরেতোরান বলেন, গত রাত পর্যন্ত আমরা কিছুই পাইনি। এরপর তারা পানি আনা শুরু করে।
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ঘরে তৈরি খাবার পৌঁছে দেওয়া তরুণী আইসমার লোপেজ বলেন, আমি যখন খাই, তখন মনে হয় কোথাও কেউ না খেয়ে আছে। তখন অপরাধবোধ হয়।
এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ভেনেজুয়েলায় তিন মাস ধরে প্রায় ৫ লাখ মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে ৫ কোটি ডলার তহবিলের আবেদন জানিয়েছে।
এদিকে নতুন উদ্বেগ হয়ে উঠেছে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র ক্রিস্টিনা লিন্ডমেয়ার বলেন, ভেনেজুয়েলায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বর্তমানে ‘চরম চাপের’ মধ্যে রয়েছে। ভূমিকম্পের আগেই টিকাদানের হার কম ছিল। ফলে হাম ও ডিপথেরিয়ার মতো টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এখন বেড়ে গেছে। অন্যদিকে উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে নাসার প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, ভূমিকম্পে সম্ভাব্য ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।