ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো রাজধানী তেহরানে মানুষের ঢল নেমেছে। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন ও দোয়া-মোনাজাতে অংশ নিচ্ছেন। এদিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও জনসমাগম অব্যাহত থাকায় পুরো এলাকায় শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করছে।
রোববার (৫ জুলাই) ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সাত দিনব্যাপী আনুষ্ঠানিক শোক ও দাফনপ্রক্রিয়ার দ্বিতীয় দিন তেহরানে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
জানাজায় কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নাকি পরিবারের কেউ ইমামতি করবেন, তা এখনো সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়নি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধের প্রথম দিন মার্কিন–ইসরায়েলি হামলায় ৮৬ বছর বয়সী খামেনি নিহত হন। ১৯৮৯ সাল থেকে তিনি ইরান শাসন করে আসছিলেন।
খামেনি নিহত হওয়ার পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে একই হামলায় তিনি আহত হয়েছেন। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা উপলক্ষে আজ পুরো ইরানে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সন্ধ্যায় তাঁর মরদেহ গ্র্যান্ড মোসাল্লা থেকে স্থানান্তর করা হবে। আগামীকাল সোমবার রাজধানীজুড়ে শোকমিছিল হবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার ও জানাজার আনুষ্ঠানিকতার প্রধান হাসান হাসানজাদেহ বলেছেন, ‘আজ স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় (গ্রিনিচ মান সময় সাড়ে ৪টা) শহীদ নেতার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।’
জানাজা উপলক্ষে রাজধানীতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে অতিরিক্ত ভিড়ে মানুষের পদপিষ্ট হওয়ার ঝুঁকির ব্যাপারেও সতর্ক করা হয়েছে।
এর আগে গতকাল শনিবার লাখ লাখ ইরানি খামেনির জানাজার আনুষ্ঠানিকতার প্রথম দিনের কর্মসূচিতে যোগ দেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের পর এ বিশাল জমায়েতকে নিজেদের শক্তি ও প্রতিরোধের বার্তা হিসেবে দেখাতে চাইছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।
গতকাল শোকের প্রতীক কালো পোশাক পরে এবং প্রতিশোধের প্রতীক রক্তলাল পতাকা হাতে শোক প্রকাশ করেন লাখো মানুষ। এ সময় সমবেত মানুষের অনেকে কান্নার পাশাপাশি ‘যুক্তরাষ্ট্র ধ্বংস হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান দেন।
আগামীকাল শোকমিছিল শেষে মঙ্গলবার খামেনির কফিন নিয়ে যাওয়া হবে নগরী কোমে। বুধবার কফিন নেওয়া হবে প্রতিবেশী দেশ ইরাকে। বৃহস্পতিবার খামেনির জন্মস্থান ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে তাঁকে দাফন করা হবে।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি কে ছিলেন?
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়ে দেশের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা হন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। তার মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সাল থেকে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করেন। পাহলভি রাজতন্ত্রের অবসান ঘটানো ইসলামী বিপ্লবের আদর্শিক নেতা ছিলেন খোমেনি। অন্যদিকে, সেই বিপ্লবের সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন খামেনি।
খামেনির মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি হন তার ছেলে মোজতবা খামেনি। তার শাসনামলের শুরুতেই এত বড় রাষ্ট্রীয় আয়োজন হতে যাচ্ছে। যদিও সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি এখনো প্রকাশ্যে আসেননি।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র শিয়া শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের প্রাক্কালে তিনি রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন।
ইরাকের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে তিনি সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন।
খামেনি ইরানের সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করেন। পাশাপাশি বহির্বিশ্বের হুমকি মোকাবিলায় একটি উন্নত প্রতিরক্ষা কৌশল প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শাসনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ আসে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। সে সময় অর্থনৈতিক দুর্দশাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশব্যাপী অস্থিরতায় রূপ নেয়। পরে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় তিনি নিহত হন। সূত্র: আল জাজিরা