বিশ্ব ফুটবলে মরক্কোর সাম্প্রতিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বড় বিনিয়োগের গল্প। দেশের বিপুল ফসফারেট সম্পদ থেকে অর্জিত আয়ের একটি অংশ ব্যয় করা হচ্ছে ফুটবল অবকাঠামো, খেলোয়াড় উন্নয়ন এবং জাতীয় দলের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে। এই বিনিয়োগই মরক্কোকে বিশ্ব ফুটবলের নতুন শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
২০২৪ সালে গঠিত জাতীয় ফুটবল প্রশিক্ষণ তহবিলের মাধ্যমে দেশটির ফুটবল উন্নয়নে নতুন গতি আসে। এই তহবিলে মরক্কো ফুটবল ফেডারেশন, বেসরকারি খাত এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে অর্থায়ন করছে। তাদের লক্ষ্য, পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে মরক্কোকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল জাতিতে পরিণত করা।
মরক্কোর ষষ্ঠ মোহাম্মদ বহুমুখী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি হিশাম এল হাবতি বলেন, দেশের উন্নয়নে অবদান রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের নির্দেশনা অনুসারে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোও জাতীয় উন্নয়ন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। তিনি জানান, নতুন অনুশীলন মাঠ নির্মাণসহ ফুটবল অবকাঠামো উন্নয়নে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থার সঙ্গেও তাদের অংশীদারত্ব রয়েছে।
তবে মরক্কোর ফুটবলে এই পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হয় আরও আগে। ২০০৯ সালে রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ সারা দেশে খেলার মাঠ নির্মাণ, তরুণদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ কোচ তৈরির উদ্যোগ নিতে সরকারকে নির্দেশ দেন। পরে ২০২৪ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি এ কর্মসূচিতে যুক্ত হলে উন্নয়ন কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়।
এই তহবিলের অর্থে নতুন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অনুশীলন ব্যবস্থা চালু এবং খেলোয়াড়দের জন্য উন্নত সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। এর সুফলও মিলতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
২০২২ সালের বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে পৌঁছে বিশ্বকে চমকে দেয় মরক্কো। সেই আসরে স্পেন, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায় তারা। চলতি বছরও আফ্রিকা মহাদেশের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে নিজেদের ধারাবাহিক সাফল্যের প্রমাণ দিয়েছে দলটি।
ফসফারেট কৃষিখাতে ব্যবহৃত সারের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। এই খনিজের বিশাল মজুত রয়েছে মরক্কোতে। ফলে বিশ্ববাজারে ফসফারেটের চাহিদা থেকে দেশটি বিপুল বৈদেশিক আয় অর্জন করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের রপ্তানি সীমাবদ্ধতা, রাশিয়াকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন নিয়ে শঙ্কার কারণে বিশ্ববাজারে ফসফারেটের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এতে মরক্কোর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অবস্থানও শক্তিশালী হয়েছে।
হিশাম এল হাবতির ভাষায়, ফুটবলে এই বিনিয়োগ শুধু দলের সাফল্যই এনে দেয়নি, বরং দেশের মানুষের মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস ও জাতীয় গর্বের জন্ম দিয়েছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে যেমন পুরো দেশ উদযাপনে মেতে উঠেছিল, এখনও সেই একই উচ্ছ্বাস ও প্রত্যাশা মানুষের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স