সারা দেশে একযোগে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে শুরু হয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষা। গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষার প্রথম দিনই ২৪ হাজার ৭৮৪ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে ৭ জন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। অথচ এসএসসি পাশ করে ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েও এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য ‘ফর্ম ফিল-আপ’ করেনি প্রায় সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ এই শিক্ষাবর্ষের ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থীই পরীক্ষা থেকে ঝরে গেছে।
এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেছেন, আগে এসএসসির পর সাধারণত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ত। বর্তমানে ঝরে পড়ার সংখ্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং আমাদের জন্য বড় প্রশ্ন। এই সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করে সেটি সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি আর না ঘটে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কামাল হায়দার ভোরের ডাককে বলেন, এবার এত সংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া সত্যিই অ্যালার্মিং। এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, এসএসসির পর একাদশে ভর্তি হয়ে অনেকে বাল্যবিবাহ করে ফেলে, এবার নতুন করে কেন্দ্রগুলোতে সিসি টিভি স্থাপনে প্রস্তুতি কম থাকায় শিক্ষার্থীরা ভয় পেয়েছে, কেউ বিদেশে চলে গেছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কামাল হায়দার জানান, অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম টিকিয়ে রাখার জন্য বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী ‘ভর্তি রয়েছে’ দেখান। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজতে আমরা একটি গবেষণা হাতে নিয়েছি। এ নিয়ে মাননীয় মন্ত্রীও আমাকে নির্দেশনা দিয়েছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ১১টি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছর আগে (২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ) এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির নিবন্ধন করেছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে এ বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য ‘ফর্ম ফিল-আপ’ করেছেন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৫ লাখ নিয়মিত শিক্ষার্থীই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেনি। ঝরে পড়ার হার দাঁড়িয়েছে ৩৬ শতাংশে। গত বছর এই হার ছিল ২৯ শতাংশের কিছু বেশি। চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাতেও এমন চিত্র দেখা গেছে। দুই বছর আগে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেও তাদের মধ্যে ২৩ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।
উচ্চশিক্ষায় পদার্পণের পূর্বে সর্বশেষ পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশ না নেওয়ার ব্যাপক প্রবণতা দেখা গেছে। ‘ফর্ম ফিল-আপ’ করেও গতকাল অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন অনুপস্থিত ছিল মোট ২৪ হাজার ৭৮৪ জন পরীক্ষার্থী। গত বছরের (২০২৫) এই পরীক্ষায় প্রথম দিনে মোট ১৯ হাজার ৭৫৯ জন অনুপস্থিত এবং তার আগের বছর (২০২৪) প্রথম দিনে অনুপস্থিত ছিলেন ১৫ হাজার ২০৩ জন পরীক্ষার্থী।
প্রথম দিনে কোন বোর্ডে অনুপস্থিত কতজন: আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে প্রথম দিনের বাংলা (আবশ্যিক) প্রথম পত্র পরীক্ষায় নিবন্ধিত ৮ লাখ ৫৬ হাজার ৯৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬৪ জন অংশ নেন। অনুপস্থিত ছিলেন ১৭ হাজার ২৩৩ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ২ দশমিক ০১ শতাংশ। ঢাকা বোর্ডে ৩ হাজার ৯৭১ জন, রাজশাহী বোর্ডে ২ হাজার ৪৬৭ জন, কুমিল্লা বোর্ডে ১ হাজার ৭৯৫ জন, যশোর বোর্ডে ২ হাজার ৭৮ জন, চট্টগ্রাম বোর্ডে ১ হাজার ৩৪০ জন, সিলেট বোর্ডে ১ হাজার ১২৭ জন, বরিশাল বোর্ডে ১ হাজার ৩৪৬ জন, দিনাজপুর বোর্ডে ১ হাজার ৯৩৭ জন এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ১ হাজার ১৮২ জন। অসদুপায়ের দায়ে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে কুমিল্লা বোর্ডে ১ জন, যশোর বোর্ডে ২ জন, দিনাজপুর বোর্ডে ১ জন এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ১ জনসহ মোট ৫ জন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে কোনো পরিদর্শককে বহিষ্কার করা হয়নি।
অন্যদিকে, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কুরআন মাজিদ পরীক্ষায় ৮০ হাজার ৬৫৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। এ বোর্ডে ৪ হাজার ৪৭৮ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন এবং অসদুপায়ের দায়ে ১ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বাংলা-২ পরীক্ষায় অংশ নেন ৮০ হাজার ৬০৩ জন পরীক্ষার্থী। এ বোর্ডে অনুপস্থিত ছিলেন ৩ হাজার ৭৩ জন এবং অসদুপায়ের দায়ে ১ জন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ঝরে পড়া শিক্ষার্থী কোন বোর্ডে কত জন: ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের আওতায় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির নিবন্ধন করেছিল ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন এ বছরের এইচএসসি পরীক্ষার জন্য ফর্ম ফিল-আপ করেছেন। বাকি ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন ফর্ম পূরণ করেননি। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ৩৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম প্রথম বর্ষে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে নিবন্ধন করেছিলেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে ৭৮ হাজার ২৬৯ জন পরীক্ষার জন্য ফর্ম পূরণ করেছেন। ৬১ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ফর্ম পূরণ করেননি, যা মোট নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর ৪৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ৩৯ শতাংশ।
অপরদিকে, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় একাদশ শ্রেণিতে (ভোকেশনাল) নিবন্ধন করেছিলেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ জন শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে মাত্র ৭৫ হাজার ১৯৭ জন পরীক্ষার জন্য ফর্ম পূরণ করেছেন। ৯০ হাজার ৩৪৫ জন ফর্ম পূরণ করেননি। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশই এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ।