বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এ নাটকীয় এক ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে পর্তুগাল। টরন্টো স্টেডিয়ামে শুক্রবার (৩ জুলাই) অনুষ্ঠিত ম্যাচে শুরু থেকে বলের দখল ও আক্রমণে আধিপত্য দেখালেও প্রথমার্ধে গোলের দেখা পায়নি রবার্তো মার্তিনেজের দল। বিরতির পর ইভান পেরিসিচের গোলে পিছিয়ে পড়লেও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পেনাল্টি এবং যোগ করা সময়ে গনসালো রামোসের দুর্দান্ত হেডে জয় নিশ্চিত করে সেলেসাওরা। ম্যাচের শেষদিকে ক্রোয়েশিয়ার আরও একটি গোল ভিএআরে বাতিল হওয়ায় নাটকীয় জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে পর্তুগাল।
ম্যাচটি ছিল অফসাইড নাটকে ভরপুর। পুরো ম্যাচে অন্তত চারটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়, যার মধ্যে তিনটিই ছিল ক্রোয়েশিয়ার।
শুরু থেকেই দুই দল আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও পরিষ্কার সুযোগ বেশি তৈরি করে পর্তুগাল। চতুর্থ মিনিটে রাফায়েল লিয়াওয়ের ক্রস থেকে ব্রুনো ফার্নান্দেসের পরপর দুটি শট দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক দোমিনিক লিভাকোভিচ। সেই আক্রমণের পর হ্যান্ডবলের আবেদন জানানো হলেও রেফারি তাতে সাড়া দেননি।
এরপরও বলের দখল ধরে রেখে একের পর এক আক্রমণ চালায় পর্তুগাল। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ফ্রি-কিক, রেনাতো ভেইগার হেড এবং ব্রুনো ফার্নান্দেসের কঠিন কোণের শট—সবই রুখে দেন লিভাকোভিচ। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়া পুরো প্রথমার্ধে নিজেদের অর্ধে গুটিয়ে থেকে রক্ষণ সামলাতে ব্যস্ত থাকলেও গোলশূন্য সমতা নিয়েই বিরতিতে যেতে সক্ষম হয়।
বিরতির পর বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ৪৮তম মিনিটে মাতেও কোভাচিচের শট দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন দিয়োগো কস্তা। এক মিনিট পর নিকোলা ভ্লাসিচও ভালো সুযোগ নষ্ট করেন। ৫৩তম মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে যোসিপ স্তানিশিচের আক্রমণ থেকে বলের গতিপথে থাকা ইভান পেরিসিচ স্পর্শ করে জালে পাঠালে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া।
তিন মিনিট পর আবারও বল জালে জড়ায় ক্রোয়েশিয়া, তবে নিকোলা ভ্লাসিচ অফসাইডে থাকায় গোলটি বাতিল হয়। ৫৮তম মিনিটে সমতায় ফেরার দারুণ সুযোগ পেয়েও ভাগ্য সহায় হয়নি পর্তুগালের। রাফায়েল লিয়াওয়ের শক্তিশালী শট লিভাকোভিচকে পরাস্ত করলেও পোস্টে লেগে ফিরে আসে। পরের মিনিটে পেতার সুচিচের শট পায়ে ঠেকিয়ে কর্নারের বিনিময়ে দলকে রক্ষা করেন দিয়োগো কস্তা।
৬০তম মিনিটে একসঙ্গে চারটি পরিবর্তন এনে আক্রমণে গতি বাড়ান রবার্তো মার্তিনেজ। তার ফলও মেলে দ্রুত। ৬৪তম মিনিটে কর্নারের সময় রেনাতো ভেইগাকে ধরে ফেলার ঘটনায় ভিএআরের সহায়তায় পেনাল্টি পায় পর্তুগাল। ৬৮তম মিনিটে স্পটকিক থেকে গোল করে ১-১ সমতা ফেরান অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। লিভাকোভিচ একদিকে ঝাঁপ দিলেও ঠান্ডা মাথায় বল বিপরীত কোণে পাঠান তিনি। এটি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে রোনালদোর প্রথম গোল। চলতি আসরে এটি তার তৃতীয় এবং বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে ১১তম গোল।
এরপর ম্যাচের অন্যতম নায়ক হয়ে ওঠেন গোলরক্ষক দিয়োগো কস্তা। ৭৫তম মিনিটে মাতেও কোভাচিচের দূরপাল্লার শট আঙুলের ডগায় ছুঁয়ে পোস্টে লাগিয়ে দেন তিনি। ফিরতি শটও মুষ্টিবদ্ধ হাতে প্রতিহত করেন। দুই মিনিট পর একা গোলরক্ষকের সামনে চলে যাওয়া ইগর মাতানোভিচের শটও অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেন কস্তা। ৮০তম মিনিটে পেতার সুচিচ বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে সেটিও বাতিল হয়। একই সময়ে রোনালদোকে তুলে রুবেন নেভেসকে মাঠে নামান মার্তিনেজ।
নাটকীয় সমাপ্তি আসে যোগ করা সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের চতুর্থ মিনিটে বাঁ দিক থেকে রাফায়েল লিয়াওয়ের নিখুঁত চিপ করা ক্রসে যশকো গভার্দিওল ও মারিন পংগ্রাচিচের মাঝখান থেকে উঁচুতে লাফিয়ে দুর্দান্ত গ্ল্যান্সিং হেডে জয়সূচক গোল করেন গনসালো রামোস। তার হেড দূরের পোস্ট ঘেঁষে জালে জড়িয়ে গেলে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় পর্তুগাল।
শেষ মুহূর্তে ক্রোয়েশিয়া আরও একবার বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে সেটি বাতিল হয়। পরে রুবেন নেভেসের গায়ে লেগে বল জালে গেলেও দীর্ঘ ভিএআর পর্যালোচনার পর অফসাইডের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করে পর্তুগাল। প্রথমার্ধে সুযোগ নষ্টের আক্ষেপ থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে রোনালদোর নেতৃত্ব, বদলি নেমে গনসালো রামোসের জয়সূচক গোল এবং দিয়োগো কস্তার একের পর এক দুর্দান্ত সেভই পর্তুগালের জয় নিশ্চিত করে।
রাউন্ড অব সিক্সটিনে পর্তুগালের প্রতিপক্ষ স্পেন। অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করা স্পেনের বিপক্ষে আগামী ৬ জুলাই কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মাঠে নামবে রোনালদোর দল।