আজ থেকে সারা দেশে একযোগে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা।
নতুন সরকার গঠনের পর এই প্রথমবার নানা কড়াকড়ি ও নতুন নিয়মে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষা। শহর ও গ্রামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান-কাঠামো ও শিক্ষকের যোগ্যতার পার্থক্য থাকলেও এবার সারাদেশের সকল শিক্ষাবোর্ডে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
এই অভিন্ন প্রশ্নপত্রে বৈষম্য বাড়বে নাকি সমতা ফিরবে, এ নিয়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে রয়েছে নানা মত-দ্বিমত। সারাদেশে একই প্রশ্নপত্র থাকায় প্রশ্নফাস ও জালিয়াতির শঙ্কা থাকলেও এ নিয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার।
বুধবার (১ জুলাই) শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন জানান, এবারের পরীক্ষা মোট ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রের অধীনে ৯ হাজার ৪৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হবে। এই বছরই প্রথম ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে সম্পূর্ণ অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হবে। এর আগে অভিন্ন প্রশ্নপত্র নিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ও-লেভেল বা এ-লেভেলের মতো পরীক্ষাতেও একই পরীক্ষার জন্য ভিন্ন প্রশ্নপত্র হয় না। সেই বিবেচনা থেকেই অভিন্ন প্রশ্নপত্রের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অভিন্ন প্রশ্নপত্র নিয়ে শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, এটি নীতিগতভাবে ভালো উদ্যোগ।
তবে বাংলাদেশের সব অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থা এক নয়। সব জায়গার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানও সমান নয়। ইনপুট ও শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় বৈষম্য রেখে শুধু মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সমতা আনা হলে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, প্রথমে শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের বৈষম্য কমিয়ে আনা দরকার। তারপর অভিন্ন প্রশ্নপত্র পুরোপুরি কার্যকর করা হলে এর সুফল বেশি পাওয়া যাবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ভালো উদ্যোগ হতে পারে, তবে এখনই আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত কিনা, সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রাজধানীর হলিক্রস কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বেগম লুৎফুন্নেছা বলেন, আমার মেয়ে এসএসসিতে গ্রামে পড়েছে। তখন গনিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়গুলোতে খুবই দুর্বল ছিল। কোয়ালিটিফুল শিক্ষকও পাইনি সেখানে। পরবর্র্তীতে ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তির পর তা ধীরে ধীরে কাভার করেছে। সেজন্য বলছি আগে শহর-গ্রামে কোয়ালিটি শিক্ষা এনশিওর করুন, তারপর অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষা নেন।
এতদিন বিভিন্ন বোর্ড আলাদা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা আয়োজন করত, ফলে প্রশ্নের মান ও কঠিনতা নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক তৈরি হতো। নতুন ব্যবস্থায় ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা ১৪টি অভিন্ন বিষয়ে একই প্রশ্নে পরীক্ষা দেবে। তবে সিলেবাসের ভিন্নতার কারণে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এবার এই ব্যবস্থার বাইরে থাকবে।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড জানিয়েছে, বাংলা, ইংরেজি, গণিত, আইসিটি, বিজ্ঞানসহ মোট ১৪টি সাধারণ বিষয়ে তাদের সিলেবাস সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে মিল রয়েছে। তাই এসব বিষয়ে এবার একই প্রশ্নপত্র ব্যবহার করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রশ্নপত্রের মান ও কঠিনতার পার্থক্যজনিত বৈষম্য কমিয়ে মূল্যায়নে সমতা আনার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দেশের যেকোনও প্রান্তের যেকোনও কেন্দ্রের পরিস্থিতি সিসিটিভির মাধ্যমে সরাসরি পর্যবেক্ষণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি ‘সিসিটিভি ক্যামেরা মনিটরিং সেল’। এছাড়া পরীক্ষা কেন্দ্রে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের শরীরে থাকবে ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’, যা অনাকাঙ্খিত ঘটনা ও নকল প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখবে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমে কোনো রকম প্রোপাগান্ডা বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ করে শিক্ষাব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে সাইবার আইনের আওতায় পুলিশকে সরাসরি গ্রেপ্তার ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রনালয়।
এবারের পরীক্ষায় সর্বমোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছে। ২০২৫ সালে সর্বমোট পরীক্ষার্থীর (নিয়মিত ও অনিয়মিত) সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৮ জন। ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে সর্বমোট ১৪৩১৬ জন পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।