পরীক্ষার হলে প্রবেশের পর অনেক শিক্ষার্থীই হঠাৎ করে দুশ্চিন্তা, ভয় বা অস্বস্তিতে ভোগেন। অতিরিক্ত নার্ভাসনেসের কারণে জানা প্রশ্নের উত্তরও ভুলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে কয়েকটি সহজ কৌশল অনুসরণ করলে দ্রুত নিজেকে শান্ত রাখা, মনোযোগ ফিরে পাওয়া এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব। তাই পরীক্ষার হলে নার্ভাস লাগলে কী করবেন, তা জানা প্রতিটি পরীক্ষার্থীর জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
যদি আপনারও এমন অনুভূতি হয়, তাহলে জেনে রাখুন-এটি খুবই স্বাভাবিক। মনোবিজ্ঞানীদের ভাষায়, গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরীক্ষা বা মূল্যায়নের আগে উদ্বেগ বা পরীক্ষাজনিত মানসিক চাপ অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই দেখা যায়। এটি দুর্বলতার লক্ষণ নয়।
বরং সঠিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলে এই চাপই আপনাকে আরও মনোযোগী করে তুলতে পারে। তাহলে পরীক্ষার হলে নার্ভাস লাগলে কী করবেন?
চলুন জেনে নেওয়া যাক কয়েকটি কার্যকর উপায়...
মনে রাখুন, আপনি একা নন : পরীক্ষার হলে চারপাশে তাকালে অনেককে হয়তো আত্মবিশ্বাসী মনে হবে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ পরীক্ষার্থীই কোনো না কোনো মাত্রায় উদ্বেগ অনুভব করে। কেউ সেটা প্রকাশ করে, কেউ করে না।
তাই নিজেকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা না করে মনে করুন, সবাই একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই উপলব্ধি অনেকটাই মানসিক চাপ কমিয়ে দেয়।
গভীর শ্বাস নিন : উদ্বেগ বাড়লে শরীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাস ছোট হয়ে আসে। তখন সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নেওয়া। চার সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিন, কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখুন, তারপর ধীরে ধীরে ছাড়ুন। এভাবে তিন থেকে পাঁচবার করলে শরীর কিছুটা শিথিল হয় এবং মনও স্থির হতে শুরু করে।
প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েই লেখা শুরু করবেন না : অনেক শিক্ষার্থী প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েই তাড়াহুড়া করে লেখা শুরু করে দেন। এতে সহজ প্রশ্নও ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।প্রথম দুই-তিন মিনিট পুরো প্রশ্নপত্র ভালোভাবে পড়ে নিন। কোন প্রশ্নের উত্তর সবচেয়ে ভালো জানেন, কোনটি পরে করবে তা মনে মনে পরিকল্পনা করুন। এতে আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং সময় ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে।
সহজ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করুন : প্রথম প্রশ্নই যদি কঠিন মনে হয়, তাহলে ভয় আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই যেসব প্রশ্নের উত্তর সবচেয়ে ভালো জানেন, সেগুলো আগে লিখুন। এতে লেখার গতি তৈরি হবে এবং ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসও ফিরে আসবে। ‘সব ভুলে গেছি’-এই অনুভূতিতে আতঙ্কিত হবেন না
পরীক্ষাকেন্দ্রে যেসব ভুল বারবার করে শিক্ষার্থীরা : অনেক সময় প্রশ্ন দেখে প্রথম মুহূর্তে মনে হয় কিছুই মনে নেই। কিন্তু কয়েক মিনিট পরই দেখা যায়, উত্তরগুলো ধীরে ধীরে মনে পড়ছে। এটি উদ্বেগের স্বাভাবিক প্রভাব। তাই আতঙ্কিত না হয়ে কিছুক্ষণ শান্ত থাকুন। প্রয়োজন হলে প্রশ্নের গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলো আন্ডারলাইন করুন বা খসড়া পাতায় মূল পয়েন্ট লিখে নিন। এতে স্মৃতি দ্রুত ফিরে আসতে পারে।
অন্যের দিকে তাকাবেন না : আপনার পাশে বসা পরীক্ষার্থী যদি খুব দ্রুত লিখতে শুরু করে, তাহলে মনে হতে পারে সে সব জানে, আর আপনি পিছিয়ে পড়েছেন। কিন্তু কেউ দ্রুত লিখছে মানেই সে ভালো লিখছে-এমন নয়। তাই অন্যের খাতা, লেখার গতি বা আচরণ দেখে নিজের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করবেন না।
সময়ের দিকে নজর রাখুন : নার্ভাস হয়ে গেলে অনেকেই একটি প্রশ্নেই অপ্রয়োজনীয় সময় ব্যয় করেন। ফলে শেষে গিয়ে সময়ের সংকট তৈরি হয়।শুরুতেই প্রতিটি প্রশ্নের জন্য আনুমানিক সময় নির্ধারণ করুন। মাঝেমধ্যে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় মিলিয়ে নিন। এতে শেষ মুহূর্তের চাপ কমে যাবে।
ভুল হলে নিজেকে দোষ দেবেন না : কোনো প্রশ্নের উত্তর মনে না পড়লে বা একটি ভুল হয়ে গেলে সেটি নিয়েই পড়ে থাকবেন না। একটি প্রশ্নের জন্য পুরো পরীক্ষা নষ্ট করার কোনো মানে নেই। যেটুকু পারেন লিখুন, তারপর পরের প্রশ্নে চলে যান। অনেক সময় পরে আবার উত্তর মনে পড়ে যেতে পারে।
ইতিবাচক কথাই বলুন নিজেকে : আমাদের নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনও পরীক্ষার সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বারবার যদি মনে করেন, ‘আমি পারব না’, ‘আমার পরীক্ষা খারাপ হবে’, তাহলে উদ্বেগ আরও বাড়বে। এর বদলে নিজেকে বলুন- আমি প্রস্তুতি নিয়েছি। আমি শান্ত থাকব। এক প্রশ্ন কঠিন হলেই পুরো পরীক্ষা কঠিন নয়। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।- এই ছোট ছোট বাক্যগুলো আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে।
পানি পান করুন : উদ্বেগের সময় মুখ শুকিয়ে যাওয়া খুব সাধারণ ঘটনা। অনুমতি থাকলে অল্প অল্প করে পানি পান করুন। এতে শরীর সতেজ থাকবে এবং মনোযোগ ধরে রাখাও সহজ হবে।
শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাল ছাড়বেন না : পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে অনেকেই মনে করেন, আর কিছু হবে না। কিন্তু শেষ ১০–১৫ মিনিটেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ উত্তর লেখা বা ভুল সংশোধন করা সম্ভব। তাই নির্ধারিত সময় শেষ না হওয়া পর্যন্ত মনোযোগ ধরে রাখুন। উত্তরপত্র জমা দেওয়ার আগে রোল নম্বর, প্রশ্ন নম্বর এবং প্রয়োজনীয় তথ্য ঠিকভাবে লেখা হয়েছে কি না, সেটিও দেখে নিন।
পরীক্ষার আগে থেকেই উদ্বেগ কমানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন : পরীক্ষার হলে নার্ভাসনেস কমাতে আগের রাতের প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, সময়মতো পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানো এবং শেষ মুহূর্তে নতুন কিছু না পড়ার অভ্যাস পরীক্ষার সময় মানসিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
নার্ভাস লাগা মানেই আপনি অযোগ্য নন। বরং এটি প্রমাণ করে, পরীক্ষাটি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই উদ্বেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখা। মনে রাখবেন, পরীক্ষার হলে সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা অন্য কারও সঙ্গে নয়, নিজের ভয় ও দুশ্চিন্তার সঙ্গে। আপনি যদি নিজের মনকে শান্ত রাখতে পারেন, তাহলে এতদিনের প্রস্তুতিও সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারবেন।