ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি ডিপোগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিশেষ করে কৃষি খাতে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। শস্য উৎপাদনকারী অঞ্চলের কৃষকরা ফসল তোলার মৌসুমে জ্বালানির অভাবে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোতে ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে মস্কোকে আলোচনায় বসতে চাপ দিচ্ছে। এতে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সংকুচিত হয়ে পড়েছে এবং বহু অঞ্চলে জ্বালানি ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের কারণে বিভিন্ন এলাকায় চালকদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। কোথায় জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে, কোন স্টেশনে লাইন কম—এ নিয়ে মানুষ একে অপরকে সাহায্য করছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষার সময় চালকদের মধ্যে সংঘর্ষও হচ্ছে।
এদিকে ‘দ্য আল্টিমেট লাক্সারি ২০২৬’ শিরোনামের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি একটি জেরি ক্যান থেকে ধীরে ধীরে তার লনমোয়ারে পেট্রোল ঢালছেন এবং ব্যঙ্গ করে বলছেন, ‘কী ঐশ্বর্য! এখন এটা কেনার সামর্থ্য কার আছে?’
অনলাইন তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি সংকট নিয়ে মানুষের আগ্রহও বেড়েছে। iPhones.ru ওয়েবসাইট জানায়, ইয়ানডেক্সের তথ্য অনুযায়ী ২১ জুন পর্যন্ত ‘কীভাবে জ্বালানি সাইফন করতে হয়’ বিষয়ে অনলাইন অনুসন্ধান এক মাস আগের ৬৯৭টি থেকে বেড়ে ৯,৩০০-এরও বেশি হয়েছে।
রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, কিছু অঞ্চলে খুচরা পেট্রোলের দাম ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ক্রিমিয়ার সেভাস্তোপোলে এক সপ্তাহেই পেট্রোলের দাম ৩০ শতাংশ বেড়েছে বলে রসস্ট্যাট জানিয়েছে।
রসস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে রাশিয়ায় পেট্রোলের গড় দাম ছিল প্রতি লিটারে ৭২.৩৮ রুবল (প্রায় ০.৯৩ ডলার)। তবে কিছু সংকটাপন্ন অঞ্চলে দাম লিটারে ২.৪২ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানিয়েছে রয়টার্স।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে দুই দেশই একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে, যার প্রভাব এখন আরও তীব্র হয়েছে। শুরুতে রাশিয়া সংকটকে স্থানীয় ও সাময়িক সমস্যা বলে উল্লেখ করলেও পরে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পরিস্থিতি স্বীকার করে বাজার স্থিতিশীল করার প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি বলেন, কৃষি খাতে জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ফসল তোলা এর ওপর নির্ভরশীল।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে দেখা যায়, রাশিয়ার উর্বর ‘ব্ল্যাক আর্থ’ অঞ্চলের কৃষকরা জ্বালানির অভাবে ফসল তুলতে সমস্যায় পড়ছেন। এমনকি এক কৃষককে জ্বালানি ক্যান ব্যবহার করতে না পেরে নিজের কম্বাইন হারভেস্টারটি চালিয়ে পেট্রোল স্টেশনে নিতে বাধ্য হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। যদিও এসব ঘটনার সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
অন্যদিকে, রুশ উপ-প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক জানিয়েছেন, সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। রাশিয়া ইতোমধ্যে ভারত থেকে সমুদ্রপথে পেট্রোল আমদানি শুরু করেছে এবং কাজাখস্তান জুলাই–আগস্টে ৫০ হাজার মেট্রিক টন পেট্রোল সরবরাহে সম্মত হয়েছে।
একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ার আগেই রাশিয়ার জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হতাশা তৈরি হয়েছিল।
সংকটের কারণে কিছু অঞ্চলে মৌলিক পরিষেবাও সীমিত করা হচ্ছে। চীন ও মঙ্গোলিয়া সীমান্তবর্তী জাবাইকালস্কি অঞ্চলে বাস রুট বাতিল করা হয়েছে এবং একটি বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান কয়েকটি জেলায় তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পরিস্থিতি দিন দিন আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। একজন নাগরিক মন্তব্য করেছেন, সবকিছুর দাম বাড়ছে—সব ডেলিভারি সড়কপথে হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রোস্তভ-অন-ডনে এক পেট্রোল পাম্পে অপেক্ষারত এক নারী বলেন, পেট্রোলের লাইনে দাঁড়ানো এখন রীতিমতো কষ্টকর হয়ে উঠেছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে হাঁটাপথে চলাচলের কথা ভাবছেন বলে জানান তিনি।
সূত্র: রয়টার্স