রুদ্ধশ্বাস লড়াই, নাটকীয় সমতা আর অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তের পেনাল্টি—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের অন্যতম রোমাঞ্চকর ম্যাচে সেনেগালকে ৩-২ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে বেলজিয়াম। ম্যাচের ১২৫তম মিনিটে পাওয়া পেনাল্টি থেকে জয়সূচক গোল করে আফ্রিকার প্রতিনিধিদের স্বপ্নভঙ্গ করে ইউরোপের দলটি। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই উল্লাসে মেতে ওঠে বেলজিয়াম, আর হৃদয়ভাঙা বিদায় নিতে হয় লড়াকু সেনেগালকে।
বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার ভোরে শেষ হওয়া ম্যাচে যে ফাউলের কারণে ওই পেনাল্টি, সেই ঘটনা ঘটে ১১৮তম মিনিটে।
অবিশ্বাস্য, অভাবনীয়, কল্পনাতীত- আরও অনেক বিশেষণই হয়তো ব্যবহার করা যায়। পাগলাটে এক লড়াইয়ের সাক্ষী হলো সিয়াটল স্টেডিয়াম। ফুটবলের সব রোমাঞ্চ-উত্তেজনা উতুঙ্গ স্পর্শ করল নির্ধারিত সময়ের শেষ কয়েক মিনিটে। খাদের কিনারা থেকে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়াল বেলজিয়াম। ম্যাচ জুড়ে দারুণ খেলেও, মুহূর্তেই দুই গোলের লিড হারিয়ে ফেলল সেনেগাল। আর অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে বিতর্কিত এক পেনাল্টিতে আরেক গোল করে জয়োল্লাসে মাতল বেলজিয়াম।
শেষ বত্রিশের ম্যাচটিতে ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল বেলজিয়াম। সেখান থেকে তিন মিনিটে দুই গোল করে ২-২ সমতা ফেরায় তারা। অতিরিক্ত সময়ের যোগ করা সময়ে তৃতীয় গোল করে, ৩-২ ব্যবধানের জয়ে শেষ ষোলোয় ওঠে ইউরোপের দলটি।
বাঁ দিক থেকে মোরেইরার ক্রস প্রতিহত হয়ে বল যায় লুকেবাকিওর কাছে, ছয় গজ বক্সের বাইরে থেকে তার শট ক্রসবার ছুঁয়ে উড়ে যায়। তবে ক্রসটি আসার সময় ইউরি টিলেমান্স ফাউলের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করে বেলজিয়াম। রিপ্লেতে দেখা যায়, সেনেগালের লামিন কামারা ক্রসটি ক্লিয়ারের চেষ্টায় বল স্পর্শই করতে পারেননি। বরং তার পা লাগে পেছন থেকে ছুটে যাওয়া টিলেমান্সের পায়ে। ধারাভাষ্যকার বলছিলেন, পেনাল্টি দেওয়া হলে সেনেগালের জন্য নির্মম হবে। ভিএআরে পর্যালোচনার পর, মনিটরে দেখে পেনাল্টিই দেন রেফারি।
সিদ্ধান্তটি নিয়ে আপত্তি জানায় সেনেগাল। এমনকি সেনেগালের এক ডিফেন্ডার পেনাল্টি স্পটের কাছে অনেকক্ষণ পড়ে থাকেন! কোনোভাবেই সরানো যাচ্ছিল না তাকে।
প্রথমে পেনাল্টি কিক নিতে প্রস্তুত হতে দেখা যায় রোমেলু লুকাকুকে। পরে কিক নিতে আসেন টিলেমান্স। ১২৫তম মিনিটে তার ঠাণ্ডা মাথার স্পট কিক জালে জড়ালে উল্লাসে মাতে পুরো বেলজিয়াম শিবির।
বেলজিয়ামের প্রথম দুটি গোল করেন এই দুজনই। লুকাকু ব্যবধান কমানোর পর, সমতা ফেরান টিলেমান্স।
শেষ ষোলোয় ওঠার দুয়ারে গিয়েও পারল না সেনেগাল। আসরের শুরুটা তাদের জন্য ভালো ছিল না। প্রথম দুই ম্যাচে ফ্রান্স ও নরওয়ের বিপক্ষে তারা হেরে যায় মোট ছয় গোল খেয়ে। তবে গ্রুপের শেষ ম্যাচে ইরাককে ৫-০ গোলে উড়িয়ে তৃতীয় সেরা দলগুলোর একটি হয়ে নকআউটে পা রাখে আফ্রিকার দলটি।
ম্যাচের ত্রয়োদশ মিনিটেই এগিয়ে যেতে পারত সেনেগাল। বাঁ দিক থেকে ইসমাইল জ্যাকবসের দারুণ ক্রসে গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া ঝাঁপিয়ে বলে হাত ছোঁয়ালেও ক্লিয়ার করতে পারেননি। ছুটে যাওয়া ইসমাইলা সারও ঠিকমতো শট নিতে পারেননি, কোনোমতে তার পায়ে বল লেগে পোস্টে বাধা পায়।
শুরু থেকে ইতিবাচক ফুটবল খেলা সেনেগালের গোলের জন্য অবশ্য বেশিক্ষণ অপেক্ষায় থাকতে হয়নি। ২৫তম মিনিটে বাঁ দিক থেকে সাদিও মানে চমৎকার ক্রস দেন বক্সে, ইসমাইলা সারের হেড কোর্তোয়াকে পরাস্ত করলেও পোস্টে লেগে ফিরে আসে, তবে কাছ থেকে জালে পাঠান হাবিব জা।
প্রথমার্ধে বেলজিয়াম তেমন কিছুই করতে পারেনি। এই সময়ে তারা গোলের সবচেয়ে কাছাকাছি যেতে পারে ৪৫তম মিনিটে। বক্সের বাইরে থেকে মাক্সিম ডি কাইপারের জোরাল শট ঝাঁপিয়ে এক হাতে ব্যর্থ করে দেন সেনেগাল গোলরক্ষক মোহি জাও।
দ্বিতীয়ার্ধের পঞ্চম মিনিটে দারুণ একটি সুযোগ হারান প্রথম গোলদাতা জা। বক্সের ভেতর বাঁ দিক থেকে চমৎকার কাট-ব্যাক করেন মানে, কিন্তু পেনাল্টি স্পটের কাছ থেকে বাইরে মারেন জা।
পরের মিনিটে অসাধারণ এক গোলে ব্যবধান দ্বিগুণ করে সেনেগাল। নিজেদের অর্ধ থেকে হাওয়ায় ভাসিয়ে থ্রু বল বাড়ান মুসা নিয়াখাতে। ইসমাইলা সার বেলজিয়ামের দুই সেন্টার-ব্যাককে পেছনে ফেলে এগিয়ে যান এবং দারুণভাবে বুক দিয়ে বল নিয়ন্ত্রণে নেন। এরপর বক্সে ঢুকে জোরাল হাফ-ভলিতে কোর্তোয়াকে পরাস্ত করেন তিনি।
চলতি আসরে ২৮ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের গোল হলো চারটি।
এই অর্ধের শুরুতেই দেশের রেকর্ড গোলস্কোরার লুকাকুকে নামান বেলজিয়াম কোচ। দ্বিতীয় গোল হজমের পর তুলে নেওয়া হয় কেভিন ডে ব্রুইনে ও জেরেমি ডোকুকে। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছিল না কিছুতেই।
৮৪তম মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে টিলেমান্সের শট উড়ে যায় ক্রসবারের ওপর দিয়ে। পরের মিনিটে অন্য প্রান্তে মানের শট ঠেকিয়ে ব্যবধান বাড়তে দেননি কোর্তোয়া। এরপরই, ওই ১৬১ সেকেন্ডের ঝড়ে অভাবনীয়ভাবে পাল্টে যায় সবকিছু।
৮৬তম মিনিটে ডান দিক থেকে তমাস মুনিয়েরের পাসে কাছ থেকে নিখুঁত ফ্লিকে ব্যবধান কমান লুকাকু। বেলজিয়ামের জার্সিতে ১৩০ ম্যাচে ৩৩ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকারের গোল হলো ৯২টি।
৮৯তম মিনিটে সমতায় ফেরে বেলজিয়াম। ডান দিক থেকে লেয়ান্ড্রো ট্রসাড ক্রস দেন বক্সে, এগিয়ে গিয়ে পাঞ্চ করার চেষ্টায় ব্যর্থ হন সেনেগাল গোলরক্ষক জাও, হেডে ফাঁকা জালে বল পাঠান টিলেমান্স।
তাতে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে, এবং সেখানেও অনেক নাটকীয়তায় সেনেগালের হৃদয় ভেঙে শেষ হাসি হাসল বেলজিয়াম।