মঙ্গল গ্রহের ভূগর্ভে প্রায় ২৪ কিলোমিটার গভীরে বিশাল ও প্রাচীন ম্যাগমা (গলিত লাভা) ব্যবস্থার সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নাসার ‘ইনসাইট’ ল্যান্ডারের সংগ্রহ করা সিসমিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এ আবিষ্কার করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার মঙ্গলের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে বদলে দিতে পারে এবং সৌরজগতের বাইরের পাথুরে গ্রহে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ থাকার সম্ভাবনাও নতুন করে উন্মোচন করেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মঙ্গলের গভীরে দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল ম্যাগমা ব্যবস্থা ছিল, যা এতদিন কেবল পৃথিবীর মতো প্লেট টেকটোনিক্স-সমৃদ্ধ গ্রহেই সম্ভব বলে মনে করা হতো। অথচ মঙ্গলে পৃথিবীর মতো চলমান টেকটোনিক প্লেট নেই। তবুও সেখানে এমন একটি বিবর্তিত ভূত্বক তৈরি হয়েছে, যা ভিন্ন ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
নাসার ইনসাইট মিশনের সিসমিক তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা মঙ্গলের পৃষ্ঠের প্রায় ২৪ কিলোমিটার নিচে থাকা একটি রহস্যময় স্তর পরীক্ষা করেন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিচের অংশে লোহা ও ম্যাগনেসিয়ামসমৃদ্ধ ‘আল্ট্রাম্যাফিক’ শিলা এবং উপরের অংশে তুলনামূলক বেশি সিলিকাযুক্ত ‘ম্যাফিক’ শিলার উপস্থিতি রয়েছে। এই গঠনই প্রাচীন ও বৃহৎ ম্যাগমা ব্যবস্থার অস্তিত্বের শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গবেষণার প্রধান লেখক, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক টোবারমোরি ম্যাককে-চ্যাম্পিয়ন বলেন, আগে ধারণা ছিল মঙ্গলের আগ্নেয় কার্যক্রম পৃথিবীর তুলনায় অনেক সরল। কিন্তু নতুন তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় একটি ম্যাগমা ব্যবস্থা ছিল, যা ভূত্বকের গঠন ও বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
গবেষণার সহ-লেখক জন ওয়েডের মতে, মঙ্গল যদি প্লেট টেকটোনিক্স ছাড়াই এমন জটিল ভূত্বক তৈরি করতে পারে, তাহলে মহাবিশ্বে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আগের ধারণার তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। যেসব পাথুরে গ্রহকে এতদিন সম্ভাবনার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোকেও নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গবেষণাটি ‘Seismic Evidence for a Melt-Depleted Lower Crust and Transcrustal Magmatism on Mars’(মঙ্গলে গলন-ক্ষয়িত নিম্ন ভূত্বক ও ভূত্বক-ব্যাপী ম্যাগমা-ক্রিয়ার ভূকম্পীয় প্রমাণ) শিরোনামে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নেচার অ্যাস্ট্রোনমি-এ প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশা, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানব বসতি স্থাপন, খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান এবং ভিনগ্রহে প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।