ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত বা সিবিউ (CBU) অবস্থায় প্লাগ-ইন হাইব্রিড (PHEV) গাড়ি আমদানির ওপর শুল্ক ব্যাপকভাবে হ্রাস করা হয়েছে।
তবে আমদানিতে বড় ছাড় দেওয়া হলেও স্থানীয়ভাবে এই গাড়ি উৎপাদন, সংযোজন ও স্থানীয় ভ্যালু অ্যাডিশনের (মূল্য সংযোজন) জন্য সমপর্যায়ের কোনো শুল্ক সুবিধা বা প্রণোদনা দেওয়া হয়নি। এর ফলে দেশে নতুন শিল্প বিনিয়োগ থমকে যাওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের শঙ্কার মুখে পড়েছে দেশীয় অটোমোবাইল খাত।
বাংলাদেশ অটোমোবাইলস এসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বামা) এই বাজেট প্রস্তাবনাকে ‘নীতিগত অসামঞ্জস্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি জানিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছে।
আমদানিতে ছাড়, উৎপাদনে শূন্য : বামার তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বাজেটে সিবিউ অবস্থায় প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে ১৮০০ সিসি পর্যন্ত আমদানি শুল্ক ৯৩ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ (১৯ দশমিক ৭২ শতাংশ হ্রাস) করা হয়েছে। অন্যদিকে, ১৮০১ থেকে ২০০০ সিসি পর্যন্ত আমদানি শুল্ক ১৩২ দশমিক ৬৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯৬ দশমিক ১০ শতাংশ (৩৬ দশমিক ২৬ শতাংশ হ্রাস) করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
একই বাজেটে এসআরও (SRO) নং ১৬৩-আইন/২০২৬/১৮/কাস্টমস-এর মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) উৎপাদনে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হলেও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি উৎপাদন খাতের জন্য কোনো দিকনির্দেশনা রাখা হয়নি। বামার সভাপতি হাফিজুর রহমান খান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান শুল্ক কাঠামো স্থানীয়ভাবে PHEV শিল্প স্থাপন ও উৎপাদনের পরিবর্তে সম্পূর্ণ প্রস্তুত গাড়ি আমদানিকে উৎসাহিত করবে। এটি সরকারের দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির নীতির পরিপন্থি।
বাজারের বাস্তবতা ও হাইব্রিড গাড়ির জনপ্রিয়তা : বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিবন্ধন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের বাজারে হাইব্রিড গাড়ির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে।
২০২১ সালে যেখানে মোট নিবন্ধিত গাড়ির ৪২ শতাংশ ছিল হাইব্রিড, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭ শতাংশে। বিপরীতে সনাতন জ্বালানি চালিত (ICE) গাড়ির সংখ্যা ৫৮ শতাংশ থেকে কমে ৪২ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে পর্যাপ্ত চার্জিং অবকাঠামোর সংকট এবং ব্যাটারির উচ্চমূল্যের কারণে শতভাগ বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) ক্রয়ের ক্ষেত্রে এখনো গ্রাহকদের মধ্যে দ্বিধা রয়েছে, যার ফলে ২০২৫ সালেও ইভি গাড়ির নিবন্ধন ছিল মাত্র ০ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞ ও খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রচলিত জ্বালানি থেকে বৈদ্যুতিক যানবাহনে রূপান্তরের মধ্যবর্তী পর্যায়ে রয়েছে। এই বাস্তবতায় প্লাগ-ইন হাইব্রিড (PHEV) প্রযুক্তি বাংলাদেশে ইভি-তে উত্তরণের একটি কার্যকর সেতুবন্ধন হতে পারে, যা জ্বালানি ব্যবহার ৪০ শতাংশ-৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করবে।
হুমকিতে দেশি-বিদেশি বড় বিনিয়োগ : বর্তমানে বাংলাদেশের অটোমোবাইল খাতের উন্নয়নে হুন্দাই, মিতসুবিশি, চেরি ও প্রোটন-এর মতো বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো স্থানীয় কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে।
এছাড়া বিশ্বখ্যাত পরিবেশবান্ধব গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডি (BYD) দেশীয় প্রতিষ্ঠান রানার অটোমোবাইলস লিমিটেডের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদন কারখানা স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বামা-র মতে, এই পরিস্থিতিতে সিবিউ আমদানিতে অতিরিক্ত সুবিধা দিয়ে দেশীয় উৎপাদনকে বঞ্চিত করা হলে এই বৃহৎ বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ সম্প্রসারণে নিরুৎসাহিত হবেন।
নীতিমালার ব্যত্যয় : বিশ্বব্যাপী অটোমোবাইল শিল্পের প্রতিষ্ঠিত নীতি ‘ট্যারিফ এসকেলেশন’ (Tariff Escalation) যেখানে তৈরি গাড়ির ওপর বেশি শুল্ক এবং যন্ত্রাংশ আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদনে সর্বোচ্চ শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়Ñ প্রস্তাবিত বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটেনি।
এছাড়া সরকারের নিজস্ব ‘অটোমোবাইল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা ২০২১’-এর ৬নং অনুচ্ছেদে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে জ্বালানি-সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব গাড়ির স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে আকর্ষণীয় কর সুবিধা দেওয়ার যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, বর্তমান বাজেট প্রস্তাবনা তার সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
বামা-র প্রস্তাবনা : দেশীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান রক্ষা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের স্বার্থে ইলেকট্রিক ভেহিকেলের মতোই (এসআরও ১৬৩-এর আদলে) স্থানীয়ভাবে প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি উৎপাদন ও সংযোজন শিল্পের জন্য সমপর্যায়ের শুল্ক সুবিধা ও প্রণোদনা দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ অটোমোবাইলস এসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বামা)।