ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠনের পর বিএনপির ছায়াতলে আসছে অসংখ্য সুবিধাভোগী নেতাকর্মী ও ব্যবসায়ীরা। তাদের ভরে চাপা পড়ছে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন, দলটির শীর্ষ নেতাদের ছত্রছায়ায় থেকে গুছিয়ে নিয়েছেন রাজনীতি ও ব্যবসা। তৎকালীন ক্ষমতাধর নেতাদের সাথে ছবি তুলে, সখ্যতা দেখিয়ে সহকর্মীদের চাপে রাখাসহ নিয়েছেন নানা সুবিধা। এখন নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভোল পাল্টিয়ে আসছেন বিএনপির ছায়াতলে। এমনই এক ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতা হাজী মো. সিরাজুল ইসলাম।
রাজধানীর কোতোয়ালী থানা সংলগ্ন বাদামতলী এলাকা বিদেশী ফল আমদানিকারকদের প্রাণকেন্দ্র। সম্প্রতি গত ২০ জুন ফল ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ঢাকা মহানগর ফল আমদানি-রপ্তানিকারক ও আড়ৎদার ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি পদে নির্বাচিত হন মুন্সিগঞ্জের বজ্রযোগিনী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী মোঃ সিরাজুল ইসলাম। বিগত ২৫ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও তিনি এই সংগঠনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফল আমদানি-রপ্তানিকারকদের এই শীর্ষ সংগঠনের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নেতাকে বসানোয় আলোচনা ভারী হচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। সিরাজুল ইসলাম কাদের ছায়াতলে আশ্রয় পাচ্ছেন তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে বিএনপির নেতাকর্মীরা ও ব্যবসায়ীরা।
বিগত ১ যুগ ধরে ফল আমদানি-রপ্তানিকারক সাধারণ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করাসহ নানা অভিযোগ উঠে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছে, আলোচিত ব্যবসায়ী এস আলমের একজন নিকটাত্মীয়র সহযোগিতা নিয়ে আমদানি-রপ্তানিতে সহায়তাকারী ব্যাংকগুলো তিনি দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। বিভিন্ন সময় ঋণপত্র খোলায় জটিলতা, ডলারের দাম বৃদ্ধি ও শুল্ক বাড়ানোর অজুহাতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের বিপাকে ফেলেছেন। এ সময় ওভার ইনভয়েসে এলসি খুলতে বাধ্য করে ১ টাকার ফল দশ টাকা দেখিয়ে বিদেশে মুদ্রা পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব কাজ সহজতর করতে সিরাজুল ইসলাম নিজেই খেজুর বাগান কিনেছেন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। মাল্টা, কমলা ও আপেল বাগান আছে ভারত, ভুটান, নেপালসহ বেশ কয়েকটি দেশে। এসব বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে ব্যবসায়িক অঙ্গণে।
ওদিকে, আওয়ামী লীগের আমলে নৌকা প্রতীক নিয়ে মুন্সিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার বজ্রযোগিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন সিরাজুল ইসলাম। একই সাথে মুন্সিগঞ্জের বজ্রযোগিনী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। ইউনিয়নটিতে ৫ বার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন তোতা মিয়া মুন্সি নামে এক বিএনপি নেতা। ২০২২ সালের ৫ ই মে তিনি মৃত্যুবরণ করলে উপনির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল। চেয়ারম্যান হওয়ার পর নানাভাবে বিতর্কিতও হন তিনি।
গত ১০ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখে জোর পূর্বক ২১০ শতাংশ জমি দখলের অভিযোগ এনে সিরাজদিখান এলাকার কালীনগর আল-আমিন মার্কেটে সংবাদ সম্মেলন করেন আব্দুল্লাহ আল জাদিদ নামের এক ব্যক্তি।
তৎকালীন সময়ে ঢাকা-৭ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের বিশ্বস্ত ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত ছিলেন সিরাজুল ইসলাম। তার সাথে একান্ত মিটিংয়ের অসংখ্য ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সয়লাব। ২০২৪ সালের নির্বাচনে হাজী সেলিমের জ্যেষ্ঠ পুত্র সোলাইমান সেলিম এই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তাকেও হাতে রাখেন। আসনটির বর্তমান সংসদ সদস্য হামিদুর রহমানের সাথে তার বেশ সখ্যতা রয়েছে। ঢাকা মহানগর ফল আমদানি-রপ্তানিকারক ও আড়ৎদার ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনে বিজয়ী হবার পর ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের সাথে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এমন ছবিও সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমত ভাইরাল।
এ বিষয়ে একাধিকবার চেষ্টা করেও সিরাজুল ইসলামকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি। তবে বর্তমানে তার এক নিকটাত্মীয়ার দেয়া তথ্যমতে, ২০১৬ সালের মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির মূল কমিটিতে মো. সিরাজুল ইসলামের সদস্য পদ রয়েছে। তখন থেকেই তিনি বিএনপি নেতাকর্মীদের অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করে আসছেন। এমপি হামিদুর রহমান তার পুরাতন বন্ধু, অনেক আগ থেকেই তার সাথে সখ্যতা রয়েছে বলেও জানান সিরাজুল ইসলামের স্বত্বাধিকারী ‘সাথী ফ্রুটস’ এর এক কর্মকর্তা।
আজিজুল হাকিম নামের এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিরাজুল সকল রকমের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সুবিধা নিয়েছেন। হাজী সেলিমের ভয় দেখিয়ে অনেক ব্যবসায়ীদের চাপে রাখছেন। এখন আবার নতুন ছাতার নিচে আসছেন।
ওদিকে আওয়ামী লীগের লেবাস ঢেকে বিএনপিতে সক্রিয় হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। মুফতিজুল কিরন নামে এক ছাত্রদল নেতা বলেন, সিরাজুল ইসলামের মত বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের টাকার কুমিররা আওয়ামী লীগ আমলেও টাকা কামাইছে, এখনো কামাচ্ছে। আর তলে তলে গোড়া ঠিক রাখতে আওয়ামী লীগকে ফান্ডিং করছে। আর আমরা আওয়ামী লীগ আমলে এদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি, এখনো আওয়ামী লীগ পিটানোর জন্য কর্মীদের নিয়ে দেশটাকে পাহারা দেই, দিন রাত জেগে থাকি। অথচ আওয়ামী লীগের বাবারা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবকের লেবাস নিয়ে চেয়ারেই ঠায় বসে আছে। উইপোকার মত এরা তলা থেকে ছিদ্র করবে, তখন টের পাইবেন। এখন কিছু বলবো না।
এ নিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ভোরের ডাককে বলেন, যারা ফ্যাসিবাদের দোসর এবং আওয়ামী লীগের সাথে দীর্ঘদিন কলুষিত ছিলেন তাদেরকে বিএনপি আশ্রয় দিবে না। আর এই ধরনের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড লোকের কাছ থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের দূরত্ব বজায় রাখতে পরামর্শ দিচ্ছি।