চব্বিশের ৫আগষ্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্র কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনের আকাঙ্খা থাকলেও সংবিধানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর ধোঁয়াশা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের চার মাস অতিবাহিত করলেও আইনি কাঠামোর বিষয়ে এখনো কাটেনি বিতর্ক। সংবিধান ‘সংশোধন’ বনাম ‘সংস্কার’ বিষয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বিভক্তি বেড়েই চলছে। এই নিয়ে বিতর্ক গড়াচ্ছে সংসদ থেকে রাজপথে।
একদিকে সরকার বিদ্যমান সংবিধানের কাঠামো ঠিক রেখে প্রয়োজনীয় ‘সংশোধন’ আনতে চায়, অন্যদিকে বিরোধী দল ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও গণভোটের রায় অনুযায়ী আমূল ‘সংস্কার’ বা নতুন সংবিধানের দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছে।
বর্তমান রাজনীতিতে দলগুলোর মধ্যে দেখা দিচ্ছে আস্থার সংকট। নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কার রূপরেখায় স্পষ্ট করে বলেছিল যে, তারা একটি ‘সংবিধান সংস্কার কমিশন’ গঠন করবে। সেখানে আওয়ামী লীগ আমলের অগণতান্ত্রিক সংশোধনীগুলো বাতিলের পাশাপাশি গণভোট ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জোরালো প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সরকার ‘সংস্কার কমিশন’ গঠনের পরিবর্তে সংসদে ১৭ সদস্যের একটি ‘সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এতেই শুরু হয়েছে বিতর্কের।
জামায়াতের অভিযোগ, বাংলাদেশের ইতিহাসে সংবিধান বারবার ক্ষমতার হাতিয়ার হয়েছে। বিএনপি তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে নিজেদের সুবিধামতো সংবিধান পাল্টাতে চায়, যেখানে বিরোধীরা কেবল ‘অলংকার’ হিসেবে থাকবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শুরুতেই তৈরি হয় শপথ নিয়ে নাটকীয়তা। জুলাই গণভোটের রায় অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল। একটি এমপি হিসেবে এবং অন্যটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের’ সদস্য হিসেবে।
জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটসঙ্গী এনসিপির এমপিরা দুটি শপথই নিলেও ক্ষমতাসীন বিএনপির এমপিরা দ্বিতীয় শপথ নিতে অস্বীকার করেন। বিএনপির দাবি, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ কোনো বৈধ আইন নয়। সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ একে ‘অন্তহীন প্রতারণার দলিল’ হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, এটি যেন “রাজহংসকে (রাষ্ট্রপতিকে) জোরপূর্বক স্বর্ণের ডিম পাড়তে বাধ্য করার মতো ঘটনা।” তার মতে, কোনো আদেশের মাধ্যমে সার্বভৌম সংসদকে কাজ শেষ করতে বাধ্য করা যায় না।
বিতর্কের মূলে রয়েছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। যেখানে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছে। বিরোধী দল জামায়াত-এনসিপির দাবি, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ এই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছে, তাই একে অস্বীকার করা মানে জনগণের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো।
অন্যদিকে সরকারের দাবি, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এমন কোনো আদেশ দিতে পারেন না যা সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তন করে।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সবকিছু সংবিধানের পথ ধরে চলবে এবং কোনো ‘বিপ্লবী সরকার’ যেহেতু নেই, তাই বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই পরিবর্তন আনতে হবে। এর প্রতিবাদ জানিয়ে গত ১ এপ্রিল বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।
এই বিতর্কের পেছনে কাজ করছে এক ধরনের ‘ক্রেডিট ওয়ার’ বা কৃতিত্বের লড়াই। জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট কারা বাস্তবায়ন করছে, তা নিয়ে দুই দলের মধ্যে এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলছে। জামায়াত মনে করে, সরকার তাদের দাবি উপেক্ষা করছে।
অন্যদিকে সরকারি দলের দাবি, জামায়াত-এনসিপি ‘সংস্কার’-এর ধোঁয়া তুলে রাজনৈতিক স্টান্টবাজি করছে এবং একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির সুযোগ খুঁজছে।
সংসদের প্রথম অধিবেশনে দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট তখন রাজপথে আন্দোলনের ডাক দেয়। গত ১৮ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত তারা ১৫ দিনের কর্মসূচি পালন করে। ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে গণমিছিল এবং বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সরকারকে সংবিধানের ‘সংস্কার পরিষদ’ গঠন করতে বাধ্য করা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে তারা এই কর্মসূচী পালন করেছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধান কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। যদি এটি কেবল সরকারের ইচ্ছাপত্র হিসেবে গণ্য হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আনতে পারবে না। আবার সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে সংবিধান পাল্টানো সহজ হলেও জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন কাজ।