কোরীয় উপদ্বীপে আবারও সামরিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করছে। উত্তর কোরিয়ার ধারাবাহিক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পদক্ষেপের জবাবে দক্ষিণ কোরিয়াও আধুনিক ড্রোন বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। দুই প্রতিবেশী দেশের পাল্টাপাল্টি সামরিক প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
গত মঙ্গলবার উত্তর কোরিয়ার বন্দরনগরী নামফোতে পাঁচ হাজার টন ধারণক্ষমতার নতুন বহুমুখী যুদ্ধজাহাজ ‘চো হাইওন’ নৌবাহিনীতে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে দেশটির নেতা কিম জং উন নৌবাহিনীকে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি তিনি জানান, বর্তমানে পাঁচ হাজার টনের দুটি যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের পর এবার ১০ হাজার টন শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এর পরদিন বৃহস্পতিবার কিম জং উনের উপস্থিতিতে উত্তর কোরিয়া উন্নত রকেট গোলন্দাজ ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির সফল পরীক্ষা চালায়। দেশটির দাবি, এটি পাঁচ বছর মেয়াদি প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ।
পরীক্ষা শেষে কিম জং উন বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতাই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। তাই প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধি তাদের জাতীয় কৌশলের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
চলতি মাসের শুরুতে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম উৎপাদনের একটি নতুন কারখানাও জনসমক্ষে প্রদর্শন করে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার এসব পদক্ষেপের পর পাল্টা প্রস্তুতি হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। শুক্রবার দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক হুমকি মোকাবিলায় ড্রোনের সংখ্যা ও কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আন গিউ-ব্যাক জানিয়েছেন, প্রায় পাঁচ লাখ সেনাসদস্যকে দক্ষ ড্রোন অপারেটর হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের মতো সহজে ড্রোন পরিচালনায় সক্ষম হবেন।
এ ছাড়া সেনাবাহিনীর সামনের সারির ইউনিটগুলোতে ১০ হাজার ড্রোন সরবরাহের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে ড্রোন আর শুধু বিশেষ বাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রতিটি সেনাসদস্যের জন্য এটি রাইফেলের মতো অপরিহার্য ব্যক্তিগত অস্ত্রে পরিণত হবে। তার মতে, স্বল্প ব্যয়ের ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার আধুনিক যুদ্ধের ধরন বদলে দিচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোরীয় উপদ্বীপ উত্তর ও দক্ষিণ—দুই রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কোরিয়া যুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও আজ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি হয়নি। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া এখনো যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি সামরিক উদ্যোগ কোরীয় উপদ্বীপে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ান।