দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৫ জনে, আহত হয়েছেন আরও শত শত মানুষ। ভূমিকম্পের তীব্রতায় ধসে পড়েছে শতাধিক ভবন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে দিনরাত কাজ করছে উদ্ধারকারী দল, আর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাজুড়ে জারি রয়েছে জরুরি অবস্থা।
ভেনেজুয়েলায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। ব্যাপক ভবন ধস ও অবকাঠামোগত ক্ষতিতে এ পর্যন্ত ২৩৫ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
আহত হয়েছেন প্রায় দেড় হাজার মানুষ। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের খোঁজে চলছে জোরালো উদ্ধার তৎপরতা; কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বৃহস্পতিবার হালনাগাদ তথ্যে ২৩৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে বিপুল মানুষ আটকা পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) আশঙ্কা, নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
স্থানীয় সময় গত বুধবার বিকালে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে ১৬০ কিলোমিটার দূরে ইয়ারাকুই রাজ্যের রাজধানী সান ফেলিপের কাছে প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর তীব্রতা ছিল ৭ দশমিক ২। এর মাত্র ৩৯ সেকেন্ড পর একই রাজ্যে ৭ দশমিক ৫ তীব্রতার আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এই ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইয়ারাকুই রাজ্যের ইউমারে শহরের প্রায় ২৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে।
ইউএসজিএসের তথ্যমতে, এটি ১৯০০ সালের পর ভেনেজুয়েলায় সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর রাতভর বেশ কয়েকটি পরাঘাত অনুভূত হয়।
উদ্ধারকর্মীরা ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছেন। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে হাসপাতাল, উদ্ধারকেন্দ্র ও ধ্বংসস্তূপের আশপাশে ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ। আহত ব্যক্তিদের অনেককে স্ট্রেচারে করে সরিয়ে নিতে দেখা যায়।
তবে বিবিসির খবরে বলা হয়, উদ্ধার তৎপরতা বেশ ধীর। অসংখ্য মানুষ ধসে পড়া ভবনের মধ্যে আটকা পড়ে আছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তাঁদের উদ্ধারে কেউ আসছেন না।
ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুইরার বাসিন্দা ৪৯ বছর বয়সি ল্যারি রোজাসের পরিবারের সদস্যরা ধসে পড়া ভবনে আটকা পড়েছেন। সেই ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের কাছে কিছুই নেই। ভেতরে যাওয়ার মতো শক্তি বা সাহসও নেই।’
ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট হোর্হে রদ্রিগেজ ক্ষতির হালনাগাদ তথ্যে জানান, ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১৬৪ থেকে বেড়ে ১৮৮ জনে পৌঁছেছে। আহতের সংখ্যা প্রায় এক হাজার থেকে বেড়ে ১ হাজার ৫২০ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০০ জন বিভিন্ন ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা রয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ২৫০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে।
ইউএসজিএসের পূর্বাভাসভিত্তিক মডেল বলছে, এই ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা যে কয়েক হাজারে পৌঁছাবে, তা অনেকটা নিশ্চিত করে বলা যায়। এমনকি তা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ারও যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতাদের উদ্যোগে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে একটি ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে। এতে কারাকাস সময় বেলা ১টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত ৩৯ হাজারের বেশি মানুষকে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
বুধবার সরকারি ছুটি থাকায় অনেক মানুষ বাসায় ছিলেন। ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্থানীয় সাংবাদিক পল ডবসন বলেন, ভেনেজুয়েলার অনেক দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় এখনও উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি। পাহাড়ি অঞ্চল ও নৌপথনির্ভর জনপদে পৌঁছানো কঠিন হওয়ায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগের অভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া চলমান পরাঘাত উদ্ধারকাজকে আরও জটিল করে তুলছে।
ভূমিকম্পে রাজধানীর কাছে অবস্থিত মাইকেতিয়া বিমানবন্দরেও ক্ষতি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, বিমানবন্দরের একটি ভবনের ছাদ ও গাঁথুনির কিছু অংশ ভেঙে পড়ছে এবং ধুলার মেঘে এলাকা ছেয়ে যাচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ বলেন, বিমানবন্দরটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে অন্যান্য দেশ থেকে উদ্ধারকারী দল ও জরুরি সহায়তা দ্রুত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।