অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি ক্রমবর্ধমান হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটি মানুষ ও প্রাণিস্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জাতীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে নানা ধরনের প্রাণীরোগ মানবদেহে ঢুকে পড়ছে। ক্ষেত্র বিশেষে মহামারিও দেখা দেয়ার আকাক্সক্ষা রয়েছে।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স হলো এমন একটি অবস্থা, যখন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক বা পরজীবী জীবাণুসমূহ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের (যেমন অ্যান্টিবায়োটিক) কার্যকারিতা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা অর্জন করে। ফলে পূর্বে কার্যকর ওষুধ দিয়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময় করা সম্ভব হয় না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘ এএমআরকে বর্তমান শতাব্দীর অন্যতম বড় বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, মাছ ও পোষা প্রাণীর চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের অপ ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের অন্যতম কারণ। প্রেসক্রিপশনবিহীন অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ বিক্রয়, চিকিৎসা এবং বিশেষজ্ঞ ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে অনভিজ্ঞদের পরামর্শের ওপর নির্ভরতার কারণে ওষুধের ভুল ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধরনের অপব্যবহারের ফলে ওষুধ-প্রতিরোধী সংক্রমণের উদ্ভব হচ্ছে।
এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে মানুষ ও প্রাণীর স্বাস্থ্যের জন্য অযৌক্তিকভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা রোধে সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি।
বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থার জাতীয় এএমআর পরামর্শক ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, এএমআর নিয়ে কাজ করার জন্য বাজেট থেকে সরাসরি বরাদ্দ প্রয়োজন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এ সংক্রান্ত কমিটি সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কমিটিগুলোর মধ্যে সমন্বয় নাহলে প্রকৃত অর্জন সম্ভব হবে না। তিনি আরো বলেন, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ গাইডলাইন বাস্তবায়ন হলে দেশে ভালো খামারি তৈরি হবে। কিন্তু ক্ষুদ্র খামারির সংখ্যা কমে আসবে। উৎপাদন হবে মানসম্পন্ন পণ্য।
জানাগেছে, প্রাণিস্বাস্থ্য খাতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ভেটেরিনারি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে।
এটি আন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে বাংলাদেশের জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের পারস্পরিক স্বাস্থ্যগত ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
এই গাইডলাইনে ভেটেরিনারি চিকিৎসক, প্রাণিসম্পদ উৎপাদনকারী, ওষুধ বিক্রেতা (ফার্মাসিস্ট), হাস-মুরগীর বাচ্চা ও ফিড (খাদ্য) ডিলার, ঔষধ উৎপাদনকারী ও বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান, পরীক্ষাগার এবং সরকারি সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।
এতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল অপব্যবহার কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক পদক্ষেপসমূহের রূপরেখা প্রদান করা হয়েছে।
যার মধ্যে রয়েছে, ভেটেরিনারি প্রেসক্রিপশন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, প্রত্যাহার সীমা/ উইথড্রয়াল পিরিয়ড (অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের নির্দিষ্ট সময়সীমার পর প্রাণীজ পণ্য বাজারজাতকরণ) নিশ্চিতকরণ, টিকাদান কর্মসূচি ও অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প ব্যবহারে উৎসাহিতকরণ এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ ও খামারের জৈব-নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নতকরণের কথা বলা হয়েছে।
এই গাইডলাইনের উদ্দেশ্য হলো, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের বাস্তব জ্ঞান ও নীতিগত বিষয়সমূহে দক্ষ করে তোলার মাধ্যমে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল চিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, প্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলার বৈশ্বিক প্রচেষ্টার সঙ্গে একাত্ম হওয়া।
এর সাফল্য নির্ভর করবে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তঃখাত সমন্বয় এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি, নজরদারি ও নীতিগত সংস্কারে টেকসই বিনিয়োগের ওপর। এএমআর ধীরে ধীরে বাংলাদেশে জনস্বাস্থের জন্য হুমকিসমূহের অন্যতম হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে, যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে মানুষ ও প্রাণি ও মৎস্যসম্পদ খাতে।
গবাদিপশু-পাখি পালন, মৎস্য চাষ (অ্যাকুয়াকালচার), পোষা প্রাণী পালনসহ অন্যান্য ভেটেরিনারি খাতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের মাত্রাতিরিক্ত ও অপব্যবহার মাল্টি ড্রাগের উচ্চমাত্রার রেজিস্ট্যান্সের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গবেষণায় গবাদিপশু-পাখি উৎপাদনে কিছু বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এতে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, জুনোটিক সংক্রমণ (প্রাণী থেকে মানুষে রোগ ছড়ানো) এবং এএমআর জীবাণুসমূহ খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে।
এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. খালেদ কনক বলেন, মৎস্য সেক্টরে মাঠ পর্যায়ে মৎস্য কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ওষুধ পৌঁছালেও এসব মৎস্য কর্মকর্তাওষুধ প্রেসক্রাইব করতে পারেনা। একারণে খামারিরা তাদের মৎস্য খামারে সমস্যা হলেই মৎস্যকর্মকর্তাদের থেকে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারে ঝুঁকছেন।
দেখা গেছে, কোনো খামারে সপ্তাহে তিনবারও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করছে। ফলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক। যা মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রেসক্রিপশনবিহীন অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ বিক্রি, নিজ ব্যবস্থাপত্রে ওষুধ ব্যবহারের প্রবণতা, মুরগীর বাচ্চা ও ফিড ডিলারসহ অন্যান্য কু-চিকিৎসক বা হাতুড়ের পরামর্শের কারণে বাংলাদেশে মাইক্রোবিয়ালের অপব্যবহারের যে সংকট তা জটিল আকার ধারণ করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাঠ পর্যায়ে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়াই অনেক ভেটেরিনারি ওষুধ সর্বত্র পাওয়া যাচ্ছে। যার ফলে ভুল ঔষদের প্রয়োগ, নির্দিষ্ট সময়সীমার আগেই চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া এবং পরিশেষে রেজিস্ট্যান্ট বা এশিয়ায় ব্যাকটেরিয়া উদ্ভবের পথ তৈরি হচ্ছে।
তদুপরি, যথাযথ ডায়াগনস্টিক সুবিধার অভাব, প্রয়োজনীয় প্রটোকলের অনুপস্থিতি এবং অপর্যাপ্ত নজরদারি ব্যবস্থার কারণে প্রায়ই তথ্য-প্রমাণের কেমন অনুমানের ওপর ভিত্তি করে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যা মৎস্য ও প্রাণিস্বাস্থ্য খাতকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলছে।