স্বাস্থ্যখাত ঢেলে সাজাতে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা

কেএম শরীফ ইমতিয়াজ

স্বাস্থ্য

দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত

2026-06-18T14:39:25+00:00
2026-06-18T14:48:31+00:00
  শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬,
৫ আষাঢ় ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
স্বাস্থ্য
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধে জোর
স্বাস্থ্যখাত ঢেলে সাজাতে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা
কেএম শরীফ ইমতিয়াজ
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ২:৩৯ পিএম  আপডেট: ১৮.০৬.২০২৬ ২:৪৮ পিএম
সংগৃহীত ছবি
দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য খাতে ইতিহাসের অন্যতম বড় বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে। নতুন বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ খাতের জন্য মোট ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। এক বছর আগে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। 

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ১ দশমিক ০১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। 

এছাড়াও ওষুধ সরবরাহ, হাসপাতাল উন্নয়ন, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি চিকিৎসা, জনবল নিয়োগ এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষাকে কেন্দ্র করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে।

সারা দেশে উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালের মান উন্নয়নে বড় পরিকল্পনা হতে নিয়েছে সরকার। প্রযুক্তিনির্ভর গ্রামীন স্বাস্থ্যসেবার মোড় ঘোড়াতে ২৮টি নতুন বড়প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এরমধ্যে রাজধানীর স্বাস্থ্যসেবার চাপ কমাতে বেসরকারি হাসপাতালের খালি শয্যা ব্যবহারের পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি মডেলের আওতায় বেসরকারি হাসপাতালের অব্যবহৃত শয্যাগুলো সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। 

এছাড়াও বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। উন্নত দেশগুলোতে ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড, টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন এবং স্বাস্থ্য তথ্যভান্ডার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তুলেছে। 

বাংলাদেশও ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণার মাধ্যমে নতুন বাজেট পরিকল্পণায় প্রশাসন, শিক্ষা, আর্থিক খাত এবং সরকারি সেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে। এখন সেই ডিজিটাল রূপান্তর স্বাস্থ্য খাতেও বিস্তৃত হওয়া সময়ের অপেক্ষা মাত্র। 

স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজেট বৃদ্ধি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও জরুরি হলো বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে খরচ করা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উন্নয়ন বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে নতুন বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, এবার বরাদ্দের একটি টাকাও ফেরত না যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। 

বিশ্লেষকদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, বরং অর্থের সঠিক ব্যবহারই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি পরিকল্পিত প্রকল্পগুলো সময়মতো বাস্তবায়ন করা যায়, জনবল সংকট দূর করা যায় এবং দুর্নীতি ও অপচয় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়, তাহলে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। অন্যথায় বড় বাজেটও কাগুজে অর্জনে সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁঁকি থেকে যাবে।

জানা যায়, স্বাস্থ্যসেবা একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা ও মানবিক অগ্রগতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। একটি দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই উন্নয়নের সুফল নাগরিকের জীবনমানকে স্পষ্টভাবে উন্নত করে। আর সেই জীবনমানের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে মানুষের স্বাস্থ্য। তাই একটি কার্যকর, সহজলভ্য এবং আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রতিটি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। 

নীতিনির্ধারকরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন এখন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অগ্রাধিকার কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর অগ্রগতি তদারকির জন্য সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে। 

সরকারের পরিকল্পনা হলো, স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রতিরোধকেন্দ্রিক করতে গ্রাম ও শহরে শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, রোগপ্রতিরোধ, পুষ্টি উন্নয়ন, মাতৃ এবং শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান, ক্যানসার, ডায়াবেটিসসহ অসংক্রামক রোগের আগাম শনাক্তকরণের ব্যবস্থা করা। এজন্য দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এরই মধ্যে। এসব বাস্তবায়ন হলে হাসপাতালে রোগীর অপ্রয়োজনীয় চাপ যেমন কমবে, তেমনি কমবে জনগণের চিকিৎসা ব্যয়ও। 

এ বিষয়ে  বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং বিশ্বব্যাংকের সাবেক স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিশেষজ্ঞ জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘স্বাস্থ্য বাজেটের একটি বড় অংশ খরচ হবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায়। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিরোধযোগ্য রোগ নিয়ে সচেতনতা কম। আবার রোগ অত্যন্ত গুরুতর পর্যায়ে না গেলে চিকিৎসকের কাছে যান না। এ দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে সরকার স্বাস্থ্য খাতকে প্রতিরোধকেন্দ্রিক ডিজিটাল রূপান্তরের নীতি গ্রহণ করেছে; যাতে রোগীর সংখ্যা কমে যায়।’

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাঁচটি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ২৫ লাখ ই-হেলথ কার্ড বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। 

এ প্রকল্পে ১৬২ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। সরকারের মতে, এই কার্ডের মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা হবে। এতে চিকিৎসা গ্রহণের ইতিহাস সহজে পাওয়া যাবে এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে। 

নীতিনির্ধারকদের ধারণা, ই-হেলথ কার্ড চালু হলে চিকিৎসা খাতে মধ্যস্বত্বভোগী, অনিয়ম এবং ভুয়া বিলের মতো সমস্যাও কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে রোগীরা বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরলেও তাদের চিকিৎসা তথ্য একক ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকবে।

তথ্যমতে, জরুরি চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ খাতে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। যার মধ্যে আগামী অর্থবছরে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। অ্যাম্বুলেন্স সেবা আধুনিকীকরণ, দ্রুত রোগী পরিবহন এবং দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুহার কমানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন খাতেও বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রায় ৩ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০ হাজার নিরাপদ পানির উৎস এবং ২৫ হাজার স্যানিটারি টয়লেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এরই মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেও বড় অঙ্কের অর্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ কর্মসূচির আওতায় বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে ২৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। 

সরকারের আশা, এই অর্থ ব্যবহার করে ধাপে ধাপে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যেখানে চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে কোনো পরিবার আর্থিক সংকটে পড়বে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে মূল সমস্যা বরাদ্দ নয়, বরং সেই বরাদ্দ ব্যয়ের সক্ষমতা। 

তিনি বলেন, সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ কমানো না হলে এবং বছরের শেষে পুরো অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হলে তবেই জনগণ বাজেট বৃদ্ধির সুফল পাবে। তবে অভিজ্ঞতা বলছে- বরাদ্দ বাড়লেও প্রকল্প বাস্তবায়ন সময়মতো না হলে জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।


Loading...
Loading...

স্বাস্থ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: