বহু প্রতীক্ষা ও নানা অনিশ্চয়তায় দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন মাসেরও বেশি সময় পারস্য উপসাগর এলাকায় আটকে থাকার পর অবশেষে হরমুজ প্রণালি সফলভাবে অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে জাহাজটির নিরাপদে গন্তব্যপথে অগ্রসর হওয়া স্বস্তির বার্তা এনে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। এই যাত্রা দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য ও নৌপরিবহন খাতের সক্ষমতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টার দিকে জাহাজটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ পাড়ি দেয়। বর্তমানে এটি জ্বালানি সংগ্রহের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের দিকে যাচ্ছে।
এর আগে সোমবার বাংলার জয়যাত্রা হরমজ পাড়ি দিতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অনুমোদন পায় বলে জানিয়েছেন বিএসসির আরেক কর্মকর্তা।
অনুমতি পাওয়ার পর বাংলাদেশ সময় সোমবার (২২ জুন) সকালে বাংলার জয়যাত্রা শারজাহ বন্দরের বহির্নোঙর থেকে ৮০ নটিক্যাল মাইল দূরের হরমুজ প্রণালির চ্যানেলের দিকে রওনা হয়।
সোমবার (২২ জুন) বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ১০ মিনিটের দিকে জাহাজের অবস্থান নির্দেশক ওয়েবসাইট ‘ভেসেল ফাইন্ডার’ এ বাংলার জয়যাত্রার অবস্থান দেখাচ্ছিল ইরানের কেশম দ্বীপ ও ওমানের বন্দর শহর খাসাব এর মধ্যবর্তী অংশে হেনগাম দ্বীপের সমান্তরালে। তখন জাহাজের গতি ছিল ৬ দশমিক ৬ নটিক্যাল মাইল।
এরপর সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ১০ মিনিটের দিকে ‘ভেসেল ফাইন্ডার’ এ দেখা যায়, ‘বাংলার জয়যাত্রা’ হেনগাম দ্বীপ অংশ অতিক্রম করে এগিয়ে গেছে। তখন জাহাজের গতিবেগ ছিল ৭ দশমিক ১ নটিক্যাল মাইল।
হরমুজ পাড়ি দিয়ে পারস্য উপসাগর অতিক্রম করে ‘বাংলার জয়যাত্রা’ ওমান উপসাগরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরের দিকে যাচ্ছে। জাহাজটির পরবর্তী বাণিজ্যিক গন্তব্য দক্ষিণ আফ্রিকা।
জাহাজের ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকালে বলেন, ভোর রাত ৩টার দিকে আমরা হরমুজ ক্রস করেছি। এসময়ে অপেক্ষমাণ অনেকগুলো জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। ইরানের নৌবাহিনী বা কোস্ট গার্ডের কাছ থেকে কোনো বাধা আসেনি। আমরা এখন আমরা ফুজাইরাহ বন্দরের পথে আছি। দুপুর ১টার দিকে জয়যাত্রা সেখানে পৌঁছাবে।
ফুজাইরা থেকে জ্বালানি তেল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করা হবে। দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে অবস্থান করায় জাহাজের তলায় শ্যাওলা ধরায় সেগুলো ওই বন্দরে পরিষ্কার করা হবে। এরপর বাংলার জয়যাত্রা সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে রওনা দেবে।
তিনি বলেন, যারা আমাদের সহযোগিতা করেছেন, আমাদের জন্য প্রার্থনা করেছেন—সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মাঝে বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালির অবস্থান। তুলনামূলক সরু এই পথই দুই উপসাগরের সংযোগ ঘটিয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন ‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি কোম্পানির অধীনে ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি জাহাজটি দুবাই এর জেবেল আলী বন্দরে ভেড়ার পরদিনই ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হয়।
এরপর থেকে পারস্য উপসাগরেই আটকে ছিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’; মাঝে একাধিকবার প্রণালি পাড়ি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে চ্যানেলের কাছাকাছি অবস্থান নিলেও তা সফল হয়নি। জাহাজটির ৩১ জন নাবিকের সবাই বাংলাদেশি।
এবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি সইয়ের পর বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালির ৮০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে অবস্থান নিয়ে প্রণালি পাড়ি দিতে আইআরজিসি’র অনুমতির অপেক্ষায় ছিল যানটি।
‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটি কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল কয়েল নিয়ে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরের বহির্নোঙরে আসে। পরদিন ওই বন্দরের ১০ নম্বর টার্মিনালে ভেড়ে।
কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হলে পণ্য খালাস বিলম্বিত হয়। বন্দরে ভেড়ার একদিন পরেই জাহাজ থেকে ২০০ মিটার দূরত্বে একটি তেল রিজার্ভারে মিসাইল হামলার পর আগুন ধরে যায়।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জেবেল আলী বন্দরের টার্মিনালে অবস্থানের মধ্যেই বন্দরের একটি স্থাপনায় ড্রোন হামলা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে ড্রোন ও মিসাইলের আনাগোনার মধ্যে ‘জয়যাত্রা’র নাবিকরা উদ্বেগ নিয়ে দিন পার করতে থাকেন।
এর কয়েকদিন পর জাহাজ থেকে পণ্য খালাস শুরু হয়। পণ্য খালাস শেষে জাহাজটির পুনরায় কাতারে ফেরার কথা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেটি বাতিল হয়। এরপর ঠিক হয় ‘বাংলার জয়যাত্রা’র মুম্বাই যাবে।
কিন্তু সেখানে যেতে হলে জাহাজটিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হত। সেই উদ্দেশ্যে রওনা দিলেও তখন আরব আমিরাতের কোস্ট গার্ড সদস্যরা ওই পথে না আগানোর পরামর্শ দিলে জাহাজটি ফিরতে বাধ্য হয়।
যুদ্ধবিরতি শুরু হলে ৮ এপ্রিল হরমুজ প্রণালি পার হতে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে নোঙর তুলে যাত্রা শুরু করেছিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’। কিন্তু অনুমতি না পাওয়ায় সেই যাত্রায় হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজটি।
এরপর ইরান বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দিলে ১৭ এপ্রিল একবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিনা সাকার বন্দর থেকে প্রণালির দিকে রওনা হয়েছিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’। পরদিন প্রণালি পাড়ির ‘অনুমতি না পেয়ে’ আবার মিনা সাকার বন্দরে ফিরে যায় জাহাজটি।
আগের তিনবারের চেষ্টা ব্যর্থ হলেও এবার সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হল ‘বাংলার জয়যাত্রা’। এর মধ্য দিয়ে পারস্য উপসাগরে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এক রুদ্ধশ্বাস যাত্রার অবসান হল।