মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) ফার্মেসি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, বিশেষ সুবিধা প্রদান এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগের প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত একজন প্রার্থীকে পরবর্তীতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হওয়ার ঘটনায় ক্যাম্পাসজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১২ আগস্ট প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আলোকে ফার্মেসি বিভাগের প্ল্যানিং কমিটি আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করে। যাচাই শেষে মোট ৩৪ জন আবেদনকারীর মধ্যে ২৬ জনকে যোগ্য এবং আটজনকে অযোগ্য (বিবেচনাধীন) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অযোগ্য ঘোষিতদের মধ্যে ছিলেন অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাফিয়া আফরিনও। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) সংযুক্ত না থাকায় তাদের আবেদনপত্র অসম্পূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
তৎকালীন বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও প্ল্যানিং কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘সাফিয়া আফরিনসহ আটজনের আবেদন অসম্পূর্ণ ছিল। এ কারণে তাদের কাউকেই ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয়নি। আমাদের কাছে পাঠানো কাগজে এনওসি ছিল না। তাই মূল কাগজের সঙ্গে এই ছাড়পত্র ছিল কি না, এটি যাচাইয়ের জন্য রেজিস্ট্রার অফিসে পাঠাই। পরবর্তীতে রেজিস্ট্রার অফিস থেকে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। পরে সাফিয়া যে ছাড়পত্র দেখিয়েছে, সেটি বৈধ ছিল না। তবে একই ত্রুটির কারণে অন্য সাতজন প্রার্থীর আবেদন বাতিল হলেও সাফিয়া আফরিনকে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি প্রাথমিকভাবে নির্বাচিতও হন বলে আমরা জানতে পেরেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্ল্যানিং কমিটি কোনো লিখিত বা মৌখিক সুপারিশ করেনি। যদি পরবর্তীতে কোনো কাগজপত্র জমা হয়ে থাকে, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি প্ল্যানিং কমিটিকে অবহিত করা উচিত ছিল। প্ল্যানিং কমিটির সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও সাফিয়া আফরিনের কথিত এনওসির কোনো কপি আমাকে দেখানো হয়নি।’
প্ল্যানিং কমিটির সদস্য এবং ফার্মেসি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘রেজিস্ট্রার অফিস থেকে যে ৯ সেট আবেদনপত্র আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে আলোচিত প্রার্থীর আবেদনপত্রে এনওসি সংযুক্ত ছিল না। তবে মূল কপির সঙ্গে এনওসি ছিল কি না, তা আমরা এখনো জানি না। এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার অফিসের কাছে একাধিকবার জানতে চাওয়া হলেও কোনো তথ্য বা কপি আমাদের দেওয়া হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘মোট ৩৪ জন আবেদনকারীর মধ্যে ২৬ জন যোগ্য এবং ৮ জন অযোগ্য ছিলেন। এনওসি সংযুক্ত না থাকায় ওই আটজন শর্ত পূরণ করতে পারেননি। তাই তাদের অযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করে তালিকা পাঠানো হয়েছিল। একই সঙ্গে ক্লোজিং নোটে উল্লেখ করা হয়েছিল, যদি মূল কপির সঙ্গে এনওসি সংযুক্ত থাকে, তাহলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’
ড. সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘সাফিয়া আফরিনকে ভাইভায় ডাকা হয়েছে বলে আমরা জেনেছি। কিন্তু মূল কপির সঙ্গে এনওসি ছিল কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ফিডব্যাক পাইনি। সংস্থাপন শাখার সঙ্গে কথা বলে আমরা জেনেছি, এনওসি অবশ্যই আবেদন গ্রহণের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নেওয়া থাকতে হবে। আবেদন শুরুর দিন থেকে শেষ দিনের মধ্যকার সময়ের এনওসিই গ্রহণযোগ্য।’
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘যদি আবেদনের সময় এনওসি জমা দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ভাইভার একদিন আগে নতুন করে এনওসি দেওয়ার প্রয়োজন কেন? আর যদি নতুন করে এনওসি জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বাকি সাতজনকে কেন একই সুযোগ দেওয়া হয়নি?’
তার ভাষায়, আটজন অযোগ্য প্রার্থীর মধ্যে কেবল একজনকে কেন ডাকা হলো, সে বিষয়ে সংস্থাপন শাখা কিংবা রেজিস্ট্রার অফিস থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। প্ল্যানিং কমিটির পক্ষ থেকেও কারণ জানতে চাওয়া হলেও কোনো উত্তর মেলেনি।
তিনি আরও বলেন, নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার প্ল্যানিং কমিটির নয়। আমাদের দায়িত্ব ছিল কে শর্ত পূরণ করেছেন আর কে করেননি, তা যাচাই করা। কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, সেটি সিলেকশন বোর্ডের বিষয়। তবে আটজন অযোগ্য প্রার্থীর মধ্যে একজনকে কেন বিশেষভাবে সুযোগ দেওয়া হলো, সেটি অবশ্যই প্রশ্নের জন্ম দেয়। এছাড়া ২০২৪ সালের এনওসি ২০২৫ সালে জমা দিলে সেটি বৈধ হওয়ার কথা নয়।
প্ল্যানিং কমিটির আরেক সদস্য সহযোগী অধ্যাপক ইশরাত জাহান ইরাও একই বিষয় তুলে ধরেছেন।
এ বিষয়ে প্ল্যানিং কমিটির আরেক সদস্য ও বর্তমান বিভাগীয় চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আশরাফ আলী বলেন, ‘রিজেন্ট বোর্ড না হওয়া পর্যন্ত আমি কোনো মন্তব্য করতে রাজি নই।’
এ বিষয়ে ২০২৬ সালের ১৮ মে রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাফিয়া আফরিন। তিনি বলেন, ‘গত ১২ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত ফার্মেসি বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে সকল শর্ত পূরণ করে আমি আবেদন করি এবং ১১ মে ২০২৬ অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রেজেন্টেশন ও ভাইভায় অংশ নিই। ভাইভা বোর্ডে আমার পারফরম্যান্সে বোর্ড সদস্যরা সন্তুষ্ট ছিলেন।’
আমি আবেদনের সঙ্গে এনওসি (NOC) সংযুক্ত করেই আবেদন করেছি এবং মূল আবেদনপত্রের সঙ্গে এনওসির মূল কপিও জমা দিয়েছি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ১০ সেট আবেদনপত্রের প্রতিটির সঙ্গে আলাদাভাবে এনওসি সংযুক্ত করার কোনো নির্দেশনা ছিল না। একজন প্রার্থীর ১০ সেট আবেদনপত্রের মধ্যে মূল কপিটি রেজিস্ট্রার অফিসে সংরক্ষিত থাকে এবং বাকি কপিগুলোর মধ্যে একটি বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটির কাছে পাঠানো হয়।
আমি ৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে তৎকালীন বিভাগীয় চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানকে জানাই যে, আমার মূল আবেদনপত্রের সঙ্গে এনওসি সংযুক্ত রয়েছে। পরদিন ৭ জানুয়ারি রেজিস্ট্রার অফিসে যোগাযোগ করলে কর্মকর্তারা এনওসির তারিখ সম্পর্কে জানতে চান। আমার আবেদনপত্রের সঙ্গে এনওসি না থাকলে তারা এনওসির তারিখ সম্পর্কে জানতেন কীভাবে—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সাফিয়া আফরিন আরও বলেন, ‘আমার এনওসির ইস্যু তারিখ কিছুটা আগের ছিল। কর্মরত প্রতিষ্ঠান স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য একবারই এনওসি ইস্যু করে। পরবর্তীতে প্রয়োজন হলে কপি পুনরায় ইস্যু করা যায়। সে কারণে নিয়োগ পরীক্ষার আগের দিন, ১০ মে ২০২৬ তারিখে আমি এনওসির একটি কপি পুনরায় সংগ্রহ করি। ভাইভা বোর্ডে এনওসি প্রদর্শনের অনুরোধ করা হলে আমি সেটি দেখাই।’
নিয়োগ পরীক্ষার প্রবেশপত্র বিতরণ নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকজন পরীক্ষার্থী অভিযোগ করেন, পরীক্ষার আগ পর্যন্ত তাদের প্রবেশপত্র দেওয়া হয়নি। সংস্থাপন শাখা থেকে রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরের অজুহাত দেখানো হলেও পরীক্ষার দিন বিতরণ করা প্রবেশপত্রে আগেই স্বাক্ষর করা ছিল।
এ বিষয়ে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আনোয়ারুল আজিম আখন্দ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রবেশপত্র বিতরণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক শাখার দায়িত্ব। এ বিষয়ে আমি অবগত ছিলাম না।
অন্যদিকে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ ওয়াহিদ বলেন, আমি সে সময় ছুটিতে থাকায় বিষয়টি আমার নজরে আসেনি। রেজিস্ট্রার অফিস থেকে প্ল্যানিং কমিটিকে ফিডব্যাক দেওয়া হয় বলে আমি জানি না এবং ইউজিসিতে লিখিত অভিযোগের বিষয়েও আমি জানি না।
সংশ্লিষ্টদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র প্রকাশ এবং পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারীদের একটি অংশ।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হয়নি।