চার বছর পর পর ফিরে আসা ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতেও। চায়ের আড্ডা, প্রিয় দলের পতাকা ওড়ানো, গায়ে জার্সি চড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক আর রাত জেগে খেলা দেখার আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রিয় দল নিয়ে তাদের পছন্দ ও যুক্তি ভিন্ন হলেও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা এবং বিশ্বকাপ ঘিরে উচ্ছ্বাসে সবাই একই সুতোয় গাঁথা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তাসফিয়া রহমান আর্জেন্টিনার একনিষ্ঠ সমর্থক ও লিওনেল মেসির ভক্ত। বিগত বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের পর এবারও দলটিকে অন্যতম ফেভারিট মনে করেন তিনি। তাসফিয়া বলেন, 'এবারের বিশ্বকাপটি আমার কাছে একটু বেশি আবেগের, কারণ হয়তো এটাই মেসির শেষ বিশ্বকাপ। তবে শুধু মেসির কারণেই নয়, আমাদের পরিবারে আর্জেন্টিনা সমর্থনের একটি ঐতিহ্য রয়েছে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে।'
তিনি আরও বলেন, 'ব্রাজিলের সঙ্গে ম্যাচ হলে উত্তেজনার পারদ অন্য মাত্রায় পৌঁছে যায়। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে, ট্রফির চেয়েও খেলোয়াড়দের মাঠের বিনয় এবং ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।'
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী রাতুল হাসান মনে করেন, বিশ্বকাপের সৌন্দর্য কেবল ট্রফি জেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার মতে, 'বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো মানুষের মধ্যে আনন্দ আর ঐক্যের এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করা। প্রিয় দল জিতলে আনন্দের সীমা থাকে না, আবার হারলে মন খারাপ হয়। কিন্তু ফুটবল আমাদের ধৈর্য ধরতে, অপেক্ষা করতে আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশা না ছাড়তে শেখায়।'
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের চিরন্তন রেষারেষি প্রসঙ্গে রাতুল জানান, 'মেসি নাকি নেইমার এই নিয়ে যে নির্ভেজাল তর্ক-বিতর্ক চলে, সেটাই মূলত বিশ্বকাপের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তবে এই রেষারেষির মধ্যেও পারস্পরিক সম্মান থাকা উচিত। আমাদের নীতি হওয়া উচিত মাঠে লড়াই, মাঠের বাইরে শ্রদ্ধা।'
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী আফিয়া জামান নিজেকে ব্রাজিলের সমর্থক দাবি করলেও নিয়মিত ফুটবল খেলা দেখেন না। তবে বিশ্বকাপের সময়কার সার্বিক পরিবেশ তাকে দারুণভাবে টানে। আফিয়া বলেন, 'বাংলাদেশে বিশ্বকাপ মানেই এক উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রিয় দলের জার্সি পরে ঘুরে বেড়ানো, ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে থেকেই চুলচেরা বিশ্লেষণ, আর সবাই মিলে একসাথে চিৎকার করে খেলা দেখা এই অনুভূতিগুলো সত্যিই অতুলনীয়।'
তিনি আরও বলেন, 'বন্ধু-বান্ধব, পরিবার বা সহপাঠীদের সাথে দল নিয়ে যে তর্ক চলে, সেটাই আসল মজা। দিনশেষে এটি কেবল একটি খেলা নয়, বরং সবাই মিলে আনন্দ করার এবং সম্পর্কগুলোকে আরও মজবুত করার একটি বড় সুযোগ।'
অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন মুজাহিদের ফুটবল দর্শন একটু ভিন্ন। তিনি জার্মানির কড়া সমর্থক। মুজাহিদের চোখে ফুটবল মানে কোনো একক ব্যক্তির নৈপুণ্য নয়, বরং একটি সুসংগঠিত দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
তিনি বলেন, 'জার্মান ফুটবল মানেই হচ্ছে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, জ্যামিতিক কৌশল, মানসিক দৃঢ়তা এবং মাঠের খেলোয়াড়দের মধ্যকার চমৎকার বোঝাপড়া।' জার্মান দলের খেলার ধরন ব্যাখ্যা করে মুজাহিদ বলেন, 'গেগেনপ্রেসিং এর মতো আধুনিক রণকৌশল এবং মাঠের প্রতি ইঞ্চি জায়গাকে নিখুঁতভাবে কাজে লাগানোর যে দক্ষতা তারা দেখায়, তা সত্যিই বিস্ময়কর। ফুটবল আসলে নিয়মের খেলা। সঠিক পরিকল্পনা ও দলগত প্রচেষ্টা থাকলে সাফল্য আসবেই।'
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতামত থেকে স্পষ্ট, সমর্থনের রং ভিন্ন হলেও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসায় তারা সবাই এক ও অভিন্ন। ভৌগোলিক দূরত্ব বা দলের ভিন্নতা ভুলে তরুণ সমাজ মেতে ওঠে অভিন্ন উল্লাসে। তাই শেষ পর্যন্ত ট্রফি কোন দলের হাতে উঠবে, সেটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই বিশ্বকাপ ঘিরে তরুণদের প্রাণচঞ্চল অংশগ্রহণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং খেলাধুলার মাধ্যমে গড়ে ওঠা মানবিক সংযোগ।