বিজয়ে চ্যালেঞ্জ থাকলেও ফুরফুরে বিএনপির প্রার্থীরা

সোহাগ রাসিফ

রাজনীতি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর এখনও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চূড়ান্ত দিনক্ষণ ঘোষণা হয়নি। তবে আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস

2026-06-20T12:26:24+00:00
2026-06-20T13:50:04+00:00
  রবিবার, ২১ জুন ২০২৬,
৭ আষাঢ় ১৪৩৩
 
রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
রাজনীতি
স্থানীয় সরকার নির্বাচন
বিজয়ে চ্যালেঞ্জ থাকলেও ফুরফুরে বিএনপির প্রার্থীরা
সোহাগ রাসিফ
শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ১২:২৬ পিএম  আপডেট: ২০.০৬.২০২৬ ১:৫০ পিএম
সংগৃহীত ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর এখনও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চূড়ান্ত দিনক্ষণ ঘোষণা হয়নি। তবে আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস থেকে দেশজুড়ে এই নির্বাচন শুরু করার প্রস্তুতি রয়েছে সরকারের। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর দলীয় প্রতীক ছাড়া অর্থাৎ নির্দলীয় প্রতীকে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। 

ভোটকে সামনে রেখে অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থীরা রয়েছেন বেশ ‘ফুরফুরে’ মেজাজে। তবে বিএনপির এই স্বস্তির আড়ালে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রধান বিরোধী দল জামায়াত-এনসিপি জোট এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র অংশগ্রহণ করতে পারলে ভোটের ফল বদলে যাবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিএনপি সরকার গঠনের পর দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদগুলো প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালনা করা হচ্ছে। আর দলীয় নেতাদেরকেই প্রশাসক হিসেবে বসানো হয়েছে। 

পরবর্তীতে স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কোনো প্রস্তুতি দৃশ্যমান না হওয়ায় এবার সাধারণ নাগরিক, সেবাগ্রহীতাসহ বিভিন্ন মহল স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছে। নির্বাচন কি আদৌ হবে, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জাতীয় সংসদে।

গত ১৬ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে কথা বলেছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। 

তিনি বলেন, চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমের পর সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। আগামী এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে এই নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ বাজেটে রাখা হয়েছে।

রয়েছে কোন্দল, ‘গুডবুকে’ সম্ভাব্য প্রার্থী: বিএনপি মহাসচিব সময়সীমা ঘোষণার পরই মাঠে নেমে পড়েছেন দলটির ইউনিয়ন থেকে সিটি পর্যায়ের বিভিন্ন স্তরের প্রার্থীরা। একেকটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হতে বিএনপির সমর্থন চান অন্তত চার-পাঁচজন। 

যাদের কেউ স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুগত, কেউ জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থীর অনুগত, কেউ আবার ভিন্ন বলয়ের। এভাবে পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি কর্পোরেশন পর্যায়েও রয়েছে একাধিক দলীয় প্রার্থী। দলের সমর্থন পেতে স্থানীয় থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন প্রার্থীরা। আর এই প্রার্থী হওয়া নিয়ে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। 

ভোটের আগেই প্রার্থী নিয়ে কোন্দল ঠেকাতে না পারলে ফলাফলে ভরাডুবি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হওয়ার শঙ্কা করছেন মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও একাধিক প্রার্থীর ভিড় সামলানোই এখন বিএনপির হাইকমান্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এদিকে বিএনপির দপ্তর সেলের একটি সুত্র জানিয়েছে, ইউনিয়ন থেকে সিটি পর্যন্ত তৃণমূলের জনপ্রিয়, ত্যাগী ও যোগ্য নেতাদের নিয়ে একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এটি বিএনপির ‘গুডবুক’। এই গুডবুকে কিছু প্রার্থীর নাম রয়েছে। এলাকায় জনপ্রিয় ও ক্লিন ইমেজের কিছু প্রার্থীদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে ইতোমধ্যে অনানুষ্ঠানিক ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দেওয়া হয়েছে। 

বিএনপির হাইকমান্ড বলেছে, তারা তিনটি প্রধান মানদণ্ডকে সামনে রেখে প্রার্থী বাছাইয়ে নজর দিচ্ছে। প্রথমত- বিগত দিনে রাজপথের আন্দোলন, সংগ্রাম ও ত্যাগ; দ্বিতীয়ত সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং সর্বশেষ প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 

বিএনপির সাংগঠনিক সভায় দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সতর্ক করে বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক। প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বা দলীয় প্রভাব খাটানো বরদাশত করা হবে না। তিনি প্রার্থীদের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য নির্দেশ দেন।

ঢাকার ২ সিটিতে হেভিওয়েটদের লড়াই: আসন্ন নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ঘিরে। ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে (ডিএসসিসি) বর্তমান প্রশাসক ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুস সালামকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। 

এছাড়া এই সিটিতে মেয়র পদে সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটির মেয়র সাদেক হোন খোকার পুত্র ইশরাক হোসেন এমপি। 

অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটিতে তাবিথ আউয়াল আবারও শক্ত প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। পাশাপাশি বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের নামও শোনা যাচ্ছে। ঢাকার এই হেভিওয়েট প্রার্থীরা ইতোমধ্যে অনানুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণায় সরব হয়ে উঠেছেন। ইতোমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন দেয়ালজুরে প্রার্থীদের ব্যানার ফেস্টুন লক্ষ্য করা গেছে। 

বিরোধী জোট ও আওয়ামী ফ্যাক্টর: বিএনপির প্রার্থীরা ফুরফুরে থাকলেও জয়ের পথ কিন্তু নিষ্কণ্টক নয়। এবারের নির্বাচনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটসঙ্গী এনসিপি। 

যেহেতু এবার দলীয় প্রতীক নেই, তাই জামায়াত ও এনসিপি প্রতিটি এলাকায় তাদের শক্তিশালী একক প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশেষ করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে জামায়াতের প্রার্থীরা বিএনপির জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হতে পারেন। জাতীয় নির্বাচনের পরপরই বিএনপির স্থানীয় নেতারা নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতি না নিলেও জামায়াতের প্রার্থীরা বসে নেই। 

ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে তার অনুসারী নেতাকর্মী, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং মহিলা শাখার নেতাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট ও দোয়া চাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ওদিকে বিএনপির আরেকটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হলো কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ। দলের কার্যক্রম পালনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। 

সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ব্যক্তিগতভাবে যোগ্য যে কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন, সেখানে রাজনৈতিক পরিচয় বাধা হবে না। 

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমও জানিয়েছেন, তাদের দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। 

নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেছেন, আওয়ামী লীগের ভোটাররা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। তবে এবার স্থানীয় নির্বাচনে তাদের দলীয় নেতাদের ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে নির্বাচনি সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। এটি আওয়ামী লীগের জন্য রাজনীতিতে ‘কামব্যাক’ করার একটি বড় সুযোগ হতে পারে।

ক্ষমতার অনুকূল হাওয়া আর তৃণমূলের সমর্থনে বিএনপির প্রার্থীরা চাঙ্গা থাকলেও, জামায়াত-এনসিপি’র শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আওয়ামী লীগের ‘ছায়া’ প্রার্থীদের মোকাবিলা করাই হবে বিএনপির জন্য আসল পরীক্ষা। 

বিধিমালা পরিবর্তনে স্বস্থিতে প্রার্থীরা: এবারের স্থানীয় নির্বাচনে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা স্বস্তিতে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো নির্বাচনি বিধিমালায় আসছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। 

নতুন সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে স্থানীয় নির্বাচনে কোনো দলীয় প্রতীক থাকবে না। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আগে যে ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের বাধ্যবাধকতা ছিল, সেটিও বাতিল করা হয়েছে। 

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, এবার নির্বাচনে কোনো পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না এবং ভোট হবে সম্পূর্ণ ব্যালট পেপারে, ইভিএম থাকছে না। এই পরিবর্তনগুলো তৃণমূলের নেতাদের জন্য প্রার্থী হওয়ার পথ অনেক সহজ করে দিয়েছে, যা তাদের মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা তৈরি করেছে।



Loading...
Loading...

রাজনীতি- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: