যুদ্ধ থামলেও কাটছে না অস্বস্তি, শান্তি নিয়ে সন্দিহান তেহরানবাসী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের তীব্রতা আপাতত কমে এলেও রাজধানী তেহরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো কাটেনি উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। যুদ্ধবিরতির পর স্বাভাবিক জীবনে

2026-06-16T11:32:43+00:00
2026-06-16T13:01:48+00:00
  বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬,
৩ আষাঢ় ১৪৩৩
 
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
যুদ্ধ থামলেও কাটছে না অস্বস্তি, শান্তি নিয়ে সন্দিহান তেহরানবাসী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬, ১১:৩২ এএম  আপডেট: ১৬.০৬.২০২৬ ১:০১ পিএম
সংগৃহীত ছবি
ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের তীব্রতা আপাতত কমে এলেও রাজধানী তেহরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো কাটেনি উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। যুদ্ধবিরতির পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা চলছে, তবে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে অনেকেই রয়েছেন শঙ্কিত। তাই বন্দুকের শব্দ থেমে গেলেও শান্তির স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দিহান তেহরানবাসী।

দীর্ঘ চার মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরে সম্মত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়লেও তেহরানের চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। বছরের পর বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা ও তীব্র উত্তেজনায় ক্লান্ত ইরানের সাধারণ মানুষের মনে এই যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতা নিয়ে তেমন কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। তেহরানের রাস্তায় সাধারণ মানুষের চোখেমুখে বরং অনিশ্চয়তা আর গভীর সংশয় ফুটে উঠেছে।

আগামী শুক্রবার চূড়ান্ত চুক্তিতে সই হওয়ার কথা রয়েছে। এর আওতায় হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হবে, যা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মূলত ইরানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এর মাধ্যমে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ তুলে নেবে, যা দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতিকে মারাত্মক চাপের মুখে ফেলেছিল।

তবে সমঝোতা হলেও বড় ও স্পর্শকাতর ইস্যুগুলো এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং বিদেশে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ ইরানি সম্পদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। এসব বিষয় ভবিষ্যতের ওপর ছেড়ে দেওয়ায় ইরানের জনমনে গভীর হতাশা দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধান বয়ে আনবে না।

তেহরানের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পারিসা নিরাপত্তার খাতিরে নিজের পুরো নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘এই চুক্তি থেকে সাধারণ মানুষের খুব বেশি লাভ হবে বলে মনে হয় না। আমাদের জীবনের স্থিতিশীলতা ফেরাতে এর পূর্ণ বাস্তবায়ন হবে বলে মনে হয় না। সাময়িকভাবে এটি কাজে দিলেও নিজেদের স্বার্থ হাসিলে উভয় পক্ষই শেষ পর্যন্ত এই চুক্তি নষ্ট করবে।’

তেহরানের আরেক বাসিন্দা মেহদি বলেন, ‘আমি মোটেও আশাবাদী নই যে এই যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হবে। এত বেশি অমীমাংসিত ও বিতর্কিত বিষয় ঝুলে আছে যে, কোনো পক্ষই পিছু হটতে রাজি নয়। আমার মনে হয় না, ইরান যেসব দাবি জানিয়েছে, তার ন্যূনতম কোনো একটিও মানতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত।’

ইরানিদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী কোনো চুক্তিতে যাওয়ার আগে মার্কিন ও জাতিসংঘের কঠোর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া জরুরি। এই নিষেধাজ্ঞার কারণেই ইরান অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত এবং বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়া বিদেশে আটকে থাকা কোটি কোটি ডলারের সম্পদ উদ্ধার এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের টোল আদায়ের দাবিও বড় বিষয়। অথচ যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এই জলপথে বিনা মাসুলে জাহাজ চলাচলের পক্ষে অনড় অবস্থানে রয়েছে।

সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা এবং ইসরায়েলের তীব্র বিরোধিতার মধ্যেও এই সমঝোতা স্মারকটি অর্জিত হয়েছে। বিশেষ করে রবিবার বৈরুতের শহরতলিতে ইসরায়েলের বোমা হামলা, যা তেহরানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা স্পর্শকাতর বিষয়, তা এই সমঝোতাকে ভেস্তে দেওয়ার উপক্রম করেছিল। এছাড়া ইরানের কট্টরপন্থীরা সরকারের আপোষমূলক নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার, যা চূড়ান্ত চুক্তির পথে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মদিন রবিবার হওয়ার কারণে তেহরান খুব কৌশলে সোমবার স্থানীয় সময় মধ্যরাতের পর এই সমঝোতার ঘোষণা দেয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রে রবিবার ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হয়, যেমনটা ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

এদিকে সোমবার তেহরানের ভ্যালিয়াসর স্কয়ারে কর্তৃপক্ষ নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইয়ের একটি বিশাল প্রতিকৃতি উন্মোচন করেছে। খামেনেই নিয়মিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস বজায় রাখার আহ্বান জানাতেন। দেশটির বিভিন্ন স্থানে কট্টরপন্থী ও সরকারপন্থী গোষ্ঠীগুলো এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোনো ছাড় না দেওয়ার পক্ষে সোচ্চার। তারা বরং খামেনেই হত্যার প্রতিশোধ না নেওয়ার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের সমালোচনা করছে।

মহাদেসে নামের এক সরকারপন্থী নারী বলেন, ‘আমার মতে, এই চুক্তি টিকবে না; যুক্তরাষ্ট্র আবারও এটি লঙ্ঘন করবে। বরং আমাদের শক্ত অবস্থানে থাকা উচিত। হরমুজ প্রণালী বন্ধ রেখে একে না খোলাই ভালো ছিল।’

তবে এই চুক্তির মাধ্যমে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধের কথা বলা হয়েছে। যদিও রবিবার রাতে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলগাদ্র বৈরুতের ওপর ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরেই সমঝোতার ঘোষণা আসে। ইরানি মিডিয়ার তথ্যানুসারে, ট্রাম্প ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলা বন্ধের শর্তে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ তুলে নিতে সম্মত হয়েছেন।

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজ দেশের বিরোধী দলের তোপের মুখে পড়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ স্পষ্ট জানিয়েছেন, লেবানন, সিরিয়া বা গাজা থেকে সেনা সরানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই এবং ইরান আক্রমণ করলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখনো প্রকাশিত না হলেও উভয় পক্ষই নিজেদের জয়ী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দাবি করেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ শেষ করতে বাধ্য করেছে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক দিক থেকে তেহরানের বাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়ার খবরে পণ্যের দাম কমার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সোমবার টানা তৃতীয় দিনের মতো ইরানি রিয়ালের দর কিছুটা বেড়েছে। স্বর্ণের দাম কমছে এবং তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জের সূচকও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। তবে এই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বিষয়টি ইরানের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অনেকগুলো জটিল বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে, যার অনেক কিছুই তেহরানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সূত্র: আল-জাজিরা



Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: