কৃষিনির্ভর মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় চলতি মৌসুমে বৈরী আবহাওয়ার কারণে বাদামের ফলন আশানুরূপ না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। মৌসুমজুড়ে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং বিরূপ আবহাওয়ার প্রভাবে অনেক ক্ষেতেই বাদাম গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে। ফলে প্রতিটি গাছে বাদামের গোটা কম হয়েছে এবং ফলের আকারও ছোট হওয়ায় উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শিবচর উপজেলার পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল—চরজানাজাত, কাঠালবাড়ী, মাদবরের চর, বন্দরখোলা, সন্ন্যাসীরচর, দওপাড়া, শিরুয়াইল ও নিলখী এলাকায় প্রতিবছর ব্যাপকভাবে বাদামের চাষ হয়ে থাকে। কম খরচে অধিক লাভের আশায় এবারও অনেক কৃষক বাদাম আবাদ করেছিলেন। তবে সময়মতো বৃষ্টি না হওয়া এবং বাদামের গোটা হওয়ার সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অনেক ক্ষেত্রে বাদাম পরিপক্ব হওয়ার আগেই গাছ শুকিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
চরজানাজাত ইউনিয়নের কৃষক জয়নাল হাওলাদার বলেন, মৌসুমের শুরুতে আবহাওয়া ভালো থাকলেও পরে দীর্ঘ খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে গাছ ঠিকমতো বেড়ে উঠতে পারেনি। গত বছরের তুলনায় এবার ফলন অনেক কম হবে বলে মনে হচ্ছে।
সন্ন্যাসীরচরের কৃষক ফেরদাউস খান বলেন, নদীভাঙনের কারণে প্রতি বছরই বাদাম চাষের জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ফলে আগের তুলনায় চাষের পরিমাণও কমেছে। জেগে ওঠা বালুচরে প্রতিবছর বাদাম চাষ করি। এবার বীজ, সার ও শ্রমিকের পেছনে অনেক টাকা খরচ করেছি। ফলন কম হলে খরচ তুলতেই কষ্ট হবে।
তিনি আরও জানান, নতুন বাদাম বাজারে উঠতে শুরু করলেও দাম গত বছরের তুলনায় বেশি। বর্তমানে প্রতি মণ কাঁচা বাদাম ৫ থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ফলন প্রায় অর্ধেক হওয়ায় ভালো দাম পেলেও লাভের মুখ দেখা কঠিন। অনেক কৃষকই বলছেন, এবার উৎপাদন খরচ ওঠানোই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিবচরের বাদামের রয়েছে দীর্ঘদিনের সুনাম ও ঐতিহ্য। উপজেলার অধিকাংশ বাদামক্ষেত বালুমাটিতে অবস্থিত, যেখানে অন্য কোনো ফসল আবাদ করা প্রায় অসম্ভব। তাই জমি পতিত না রেখে কৃষকরা বাধ্য হয়েই বাদাম চাষ করে থাকেন। তবে অন্যান্য ফসলের তুলনায় বাদাম চাষে খরচ ও শ্রম তুলনামূলক কম হওয়ায় এটি কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় ফসল।
শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলীমুজ্জামান বলেন, এ বছর উপজেলায় প্রায় ৯৬০ হেক্টর জমিতে বাদামের আবাদ হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে ফলন কিছুটা কম হলেও কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন। আমরা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি এবং ভবিষ্যতে আবহাওয়াসহিষ্ণু জাতের বাদাম চাষে উৎসাহিত করছি।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। সময়মতো বৃষ্টি ও অনুকূল আবহাওয়া না থাকায় বাদামের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
বাম্পার ফলনের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন শিবচরের বাদামচাষিরা। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেই স্বপ্ন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। এখন লোকসান এড়ানোই তাদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।